তারাতলা বিপর্যয়ের নেপথ্যে ত্রুটিপূর্ণ প্ল্যান, ৩১ জুলাই পর্যন্ত কলকাতায় সব বাণিজ্যিক নির্মাণকাজ স্থগিত
কলকাতার তারাতলায় নির্মীয়মান গোডাউন বিপর্যয়ের জন্য ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য দুর্নীতিকে দায়ী করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ, গোটা ঘটনার পিছনে ‘টাকার খেলা’ রয়েছে এবং যথাযথ নিয়ম না মেনেই নির্মাণকাজ চলছিল। এই ঘটনার জেরেই কলকাতা পুরসভা এলাকায় সমস্ত বাণিজ্যিক নির্মীয়মান প্রকল্পের কাজ আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার।
বুধবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিশেষ করে জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ হওয়া প্রকল্পগুলির উপর বাড়তি নজর দেওয়া হবে। রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়ালের তত্ত্বাবধানে কলকাতা পুরসভা, দমকল, পূর্ত দপ্তর, সিভিল ডিফেন্স এবং কেএমডিএ-র প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ অডিট কমিটি গঠন করা হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে কলকাতা পুরসভা এলাকার সমস্ত বাণিজ্যিক নির্মাণ প্রকল্পের নিরাপত্তা, বিল্ডিং প্ল্যান এবং সরকারি অনুমোদনের বৈধতা খতিয়ে দেখে রিপোর্ট জমা দেবে এই কমিটি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রয়োজনে মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ ও বন্দর কর্তৃপক্ষকেও এই সমীক্ষার আওতায় আনা হতে পারে। একই ধরনের অডিট কমিটি হাওড়া ও বিধাননগর পুরনিগম এলাকাতেও গঠন করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। যেসব প্রকল্প অডিটে উত্তীর্ণ হবে, তারাই আগামী ১ আগস্ট থেকে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু করার অনুমতি পাবে।
‘বৃষ্টির জন্য নয়, নির্মাণগত ত্রুটির কারণেই বিপর্যয়’
ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী, এনডিআরএফ এবং কলকাতা পুরসভার আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক তদন্তে বৃষ্টির কারণে মাটি নরম হয়ে যাওয়ার তত্ত্ব খারিজ হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্মাণকাজে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা নকশাগত খামতিই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নির্মাণস্থলে ব্যবহৃত ভারী লোহার স্ট্রাকচার এতটাই ওজনদার ছিল যে উদ্ধারকাজে প্রাথমিকভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কাছে সেই পরিমাণ ভারী স্ট্রাকচার সরানোর উপযুক্ত ক্রেন বা কাটিং যন্ত্র না থাকায় দ্রুত সেনাবাহিনী ও এনডিআরএফ-এর সাহায্য নেওয়া হয়।
বিপর্যয় মোকাবিলায় পরিকাঠামোর অভাব নিয়ে প্রশ্ন
তারাতলা দুর্ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, পূর্ববর্তী প্রশাসন কেন প্রসাদব্রিজ ও গার্ডেনরিচের মতো বড় দুর্ঘটনার পরেও উন্নত বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। তাঁর মতে, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মৃত ৪, আহত অন্তত ১৮
মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে তিনজনের মৃত্যুর কথা জানালেও সরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা চার বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। মৃতদের মধ্যে দু’জনের পরিচয় জানা গেছে—রোহিত চৌধুরী ও কৃষ্ণ চৌধুরী। তাঁরা নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। একজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।
এছাড়াও অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। তাঁদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। বুধবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
এদিকে, মৃত ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বিস্তারিত বিবৃতি দেবেন মুখ্যমন্ত্রী।
উল্লেখযোগ্য তথ্য
১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে প্রকল্পটির বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদিত হয়েছিল।
জমির মালিক এসএমপিএ নামে একটি সংস্থা।
শম্ভুনাথ বেহেরাকে জমিটি লিজে দেওয়া হয়েছিল।
৩১ জুলাই পর্যন্ত কলকাতায় সমস্ত বাণিজ্যিক নির্মাণকাজ স্থগিত।
বিশেষ অডিট কমিটি এক মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেবে।
অডিটে উত্তীর্ণ প্রকল্পগুলিই ১ আগস্ট থেকে কাজ শুরু করতে পারবে।