বাঁকুড়ার রুক্ষ মাটিতেও এবার বেগুনের বাম্পার ফলন, কৃষকদের দিশা দেখাচ্ছে 'ব্ল্যাক পলি মালচিং'
ব্যাবসা বাণিজ্য

বাঁকুড়ার রুক্ষ মাটিতেও এবার বেগুনের বাম্পার ফলন, কৃষকদের দিশা দেখাচ্ছে 'ব্ল্যাক পলি মালচিং'

বাঁকুড়া জেলার নাম উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল মাটির বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর জলের আকালের চিরচেনা ছবি। এই জেলার ল্যাটেরাইট বা কাঁকুরে মাটিতে চাষবাস করা কৃষকদের কাছে বরাবরই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার
X WhatsApp

বাঁকুড়া জেলার নাম উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল মাটির বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর জলের আকালের চিরচেনা ছবি। এই জেলার ল্যাটেরাইট বা কাঁকুরে মাটিতে চাষবাস করা কৃষকদের কাছে বরাবরই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শাকসবজির ফলন এখানে আবহাওয়া এবং মাটির প্রকৃতির উপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল। মাটিতে জৈব কার্বনের চরম অভাব, জল ধরে রাখার অত্যন্ত কম ক্ষমতা, দ্রুত বাষ্পীভবন এবং বৃষ্টির খামখেয়ালিপনা বা মাঝে মাঝেই খরার প্রাদুর্ভাব— সব মিলিয়ে সবজি চাষিদের নিত্যদিন এক অসম লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। এই তীব্র প্রতিকূল পরিবেশের মাঝেও এবার সবজি চাষে, বিশেষ করে বেগুন চাষে রীতিমতো বিপ্লব এনে দিয়েছে একটি আধুনিক ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি। যার পোশাকি নাম ‘ব্ল্যাক পলি মালচিং’। মূলত রাজ্য সরকারের কমপ্রিহেনসিভ এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (ডব্লিউবিসিএডিসি) এবং বাঁকুড়ার কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের (কেভিকে) যৌথ উদ্যোগে কৃষকদের মধ্যে এই পরিবেশবান্ধব ও সম্পদ-সংরক্ষণকারী বিশেষ পদ্ধতির ব্যাপক প্রসার ঘটানো হচ্ছে।

বাঁকুড়ার মতো খরাপ্রবণ জেলায় বেগুন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হলেও, এতদিন একাধিক কারণে এর ফলন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হত। আগাছার মাত্রাতিরিক্ত উপদ্রব, জলের অভাব, মাটির তাপমাত্রার চরম ওঠা-পড়া এবং সারের অকার্যকারিতার কারণে কৃষকরা প্রায়শই ক্ষতির মুখে পড়তেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করতে গিয়ে কৃষকরা জমিতে যে সার প্রয়োগ করতেন, তার একটি বড় অংশ হয় ক্ষতিকর আগাছা শুষে নিত, নয়তো পরিবেশগত কারণে বাষ্পীভূত হয়ে নষ্ট হয়ে যেত। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে দাঁড়াত। এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার এক যুগান্তকারী ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান হিসেবে উঠে এসেছে ব্ল্যাক পলি মালচ বা কালো পলিথিনের আচ্ছাদন প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে চাষের জমি বা মাটির বেডগুলিকে একটি বিশেষ ধরনের কালো পলিথিন দিয়ে সম্পূর্ণ ঢেকে দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট দূরত্বে ফুটো করে সেখানে বেগুনের চারা রোপণ করা হয়। এর ফলে গাছের শিকড় সংলগ্ন এলাকায় এক অতি অনুকূল পরিবেশ বা মাইক্রোক্লাইমেট তৈরি হয়। পলিথিনের আস্তরণ থাকার কারণে মাটি থেকে জলের বাষ্পীভবন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ফলে আর্দ্রতা বজায় থাকে দীর্ঘক্ষণ। পাশাপাশি, সূর্যের আলো সরাসরি মাটিতে না পড়ার কারণে ক্ষতিকর আগাছাও জন্মাতে পারে না, যা গাছের পুষ্টির প্রধান অন্তরায়।
ইতিমধ্যেই বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী, বড়জোড়া, সারেঙ্গা, রানিবাঁধ, ছাতনা এবং সিমলাপালের মতো ছ’টি ব্লকে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বেগুন চাষে এই ব্ল্যাক পলি মালচিংয়ের সফল প্রয়োগ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে জমিতে অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি আর্দ্রতা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। আর ফলন বৃদ্ধির পরিসংখ্যান রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। সাধারণ পদ্ধতিতে যেখানে হেক্টর প্রতি বেগুনের গড় ফলন মিলত ১২.১৭ টন, সেখানে ব্ল্যাক পলি মালচিং পদ্ধতিতে ফলন একধাক্কায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে হেক্টর প্রতি ২৩.০৮ টনে। অর্থাৎ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জলের সঠিক ব্যবহার এবং গাছের পুষ্টির সহজলভ্যতার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি যে কতটা কার্যকরী, এই পরিসংখ্যানই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
ভারত সরকারের দেশব্যাপী ‘সুষম সারের ব্যবহার’ (ব্যালেন্সড ইউজ অফ ফার্টিলাইজার) নামক অভিযানের অঙ্গ হিসেবেই দেশ জুড়ে এই মালচিং প্রযুক্তির প্রচার চালানো হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, এই পলিথিনের আচ্ছাদন কোনো জাদুকরী বিকল্প নয়। এ প্রসঙ্গে সোনামুখী কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের (কেভিকে) প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর মৌমিতা দে (গুপ্ত) বলেন, "এই প্রচার অভিযানের মূল বার্তাটি হলো, ব্ল্যাক পলি মালচ কোনোভাবেই সারের বিকল্প নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তি যা সার ব্যবহারের কার্যকারিতাকে অনেকাংশে উন্নত করে।"
আধুনিক এই প্রযুক্তির সম্পূর্ণ সুফল পেতে কৃষি বিশেষজ্ঞরা আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিচ্ছেন। তাঁরা জানাচ্ছেন যে, মালচিংয়ের পাশাপাশি জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব সার (ফার্মইয়ার্ড ম্যানিওর) বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা উচিত। এর সঙ্গে মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সঠিক মাত্রায় এনপিকে (নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম) প্রয়োগ, ধাপে ধাপে নাইট্রোজেন সার দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অণুাদ্য সরবরাহ করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া সঠিক সময়ে সেচের ব্যবস্থা করা এবং ফসল তোলার পর জমিতে ব্যবহৃত পলিথিন মালচ যাতে পরিবেশের দূষণ না ঘটায়, তার জন্য সেগুলির সুরক্ষিত ও বিজ্ঞানসম্মত অপসারণের উপরেও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। বাঁকুড়ার এই অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছে যে, শুধুমাত্র আধুনিক ও সঠিক প্রযুক্তির হাত ধরে খরাপ্রবণ ও রুক্ষ অঞ্চলেও কৃষির চেহারা আমূল বদলে দেওয়া সম্ভব। আগামী দিনে রাজ্যের অন্যান্য রুক্ষ ও বৃষ্টি-নির্ভর কৃষি অঞ্চলেও এই ব্ল্যাক পলি মালচিং প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে, তা গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট মহল।

KOLOROB Note

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে আমাদের Contact পৃষ্ঠার মাধ্যমে জানান। যাচাই শেষে সংশোধনী প্রকাশ করা হবে।

সম্পর্কিত খবর আরও →
শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর, নতুন সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নেই
ব্যাবসা বাণিজ্য

শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর, নতুন সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নেই

শিল্পে জোয়ার বাংলায়! ৬০০ কোটির আমূল মেগা প্ল্যান্টে সাঁকরাইল থেকে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
ব্যাবসা বাণিজ্য

শিল্পে জোয়ার বাংলায়! ৬০০ কোটির আমূল মেগা প্ল্যান্টে সাঁকরাইল থেকে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মেগা বিনিয়োগ, আলোচনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ধনকুবের রবিন খুদা
ব্যাবসা বাণিজ্য

ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের মেগা বিনিয়োগ, আলোচনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ধনকুবের রবিন খুদা