রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমুখী প্রকল্পের সুবিধা আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিশ্ছিদ্রভাবে পৌঁছে দিতে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ করতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আগামী ১৫ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত রাজ্য জুড়ে তিন দিন ব্যাপী আয়োজিত হতে চলেছে বিশেষ ‘জনকল্যাণ শিবির’ (জেকেএস)। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হল, বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা এবং তার প্রকৃত উপভোক্তাদের মধ্যে যে প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক দূরত্ব রয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে দূর করা। প্রশাসনের শীর্ষ স্তরের আধিকারিকদের মতে, এটি আসলে একটি সমন্বিত ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ বা এক জানলা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে আর বিভিন্ন দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে হয়রান হতে হবে না। এক ছাতার তলাতেই মিলবে একাধিক সরকারি পরিষেবার সমাধান।
এই তিন দিনের শিবিরে শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের থেকে আবেদন গ্রহণ করেই দায় ঝেড়ে ফেলা হবে না। বরং এই ক্যাম্পগুলির চরিত্র হবে সম্পূর্ণ আলাদা। রাজ্য প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই প্রসঙ্গে জানান, “আমাদের লক্ষ্য হল সরকারি পরিষেবাকে একেবারে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। কোনো যোগ্য ব্যক্তি যাতে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বাদ না পড়েন, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। শিবিরে বসেই যাতে অন-স্পট সমস্ত কাজ করা যায়, তার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরি রাখা হচ্ছে।” সেই অনুযায়ী, এই শিবিরগুলিতে একই সাথে স্পট রেজিস্ট্রেশন বা তাৎক্ষণিক নথিভুক্তি, জমা পড়া নথিপত্র যাচাইকরণ, উপযুক্ত উপভোক্তার হাতে সরাসরি পরিষেবা বা সুযোগ-সুবিধা হস্তান্তর এবং আমজনতার নানাবিধ অভাব-অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি তথা গ্রিভান্স রিড্রেসালের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রশাসনের ঘরের দরজায় চলে আসার এই উদ্যোগের মাধ্যমে শেষ মাইলের মানুষের কাছে পৌঁছানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।
সমগ্র রাজ্য জুড়ে এই বিপুল ও ব্যাপক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও নিঁখুত রূপরেখা তৈরি করেছে নবান্ন। গ্রামীণ এবং নগর অঞ্চলের জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিন্যাসের কথা মাথায় রেখে এই শিবিরগুলির বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, গ্রামীণ এলাকার ক্ষেত্রে প্রতি ৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত পিছু একটি করে এই জনকল্যাণ শিবির গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলের পুরসভা এলাকার ক্ষেত্রে প্রতি ১০টি ওয়ার্ড পিছু একটি করে বিশেষ শিবিরের আয়োজন করা হবে। কলকাতা পৌরনিগম-সহ রাজ্যের অন্যান্য সমস্ত মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন বা পৌরনিগম এলাকার জন্য অবশ্য নিয়ম কিছুটা ভিন্ন। কর্পোরেশন এলাকাগুলিতে প্রতি বরো (Borough) পিছু একটি করে শিবির করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কলকাতা পুরসভার অন্তর্গত ১৬টি বরোতেই ১৬টি বিশেষ শিবির বসবে, যাতে শহরের বাসিন্দারাও সমানভাবে উপকৃত হন।
এই বিশাল যজ্ঞ যাতে কোনো রকম ত্রুটি ছাড়াই সম্পন্ন হয় এবং পুরো प्रक्रियाটি যাতে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও গতিশীল থাকে, তার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির বড়সড় সাহায্য নিচ্ছে রাজ্য সরকার। পুরো অভিযানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ এবং ট্র্যাক করতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নতুন আইটি পোর্টাল বা তথ্যপ্রযুক্তি পোর্টাল চালু করা হচ্ছে। এই পোর্টালের মাধ্যমে কোন শিবিরে প্রতিদিন কত আবেদন জমা পড়ল, কতগুলির স্পট ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ সম্পন্ন হল এবং কতজন মানুষ সরাসরি পরিষেবা পেলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রিয়েল-টাইমে রাখা হবে। এই সামগ্রিক মহতী উদ্যোগের নোডাল দপ্তর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজ্যের পরিকল্পনা, পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন দপ্তরকে (Department of Planning, Statistics and Programme Implementation)। এই দপ্তরই পুরো শিবিরের কাজের গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় করবে।
এই কর্মসূচীকে সর্বাঙ্গীনভাবে সফল করতে এবং প্রশাসনিক নজরদারি নিশ্ছিদ্র রাখতে বিভিন্ন স্তরে উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। রাজ্য স্তরের সর্বোচ্চ ‘জেকেএস’ কমিটির নেতৃত্বে থাকছেন স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যসচিব, যিনি সরাসরি পুরো বিষয়টির তদারকি করবেন। জেলা স্তরে এই অভিযানের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবেন জেলাশাসকেরা (ডিএম)। মহকুমা এবং ব্লক স্তরে এই টাস্ক ফোর্সের দেখভাল করবেন যথাক্রমে মহকুমা শাসক (এসডিও) এবং ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকরা (বিডিও)। আর কলকাতা-সহ অন্যান্য কর্পোরেশন এলাকাগুলির দায়িত্বে থাকবেন সংশ্লিষ্ট পুরনিগমের কমিশনাররা। ইতিমধ্যেই রাজ্য টাস্ক ফোর্সের পক্ষ থেকে এই জনকল্যাণ শিবিরের রূপায়ণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড Operating প্রসিডিউর বা এসওপি (SOP) তৈরি করা হয়েছে, যা দ্রুত সংশ্লিষ্ট সব মহলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নবান্নের তরফ থেকে সমস্ত স্তরের আধিকারিক ও কর্মকর্তাদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এবং সমস্ত নির্দেশিকা মেনে এই শিবিরের কাজ সফল করা হয়। প্রশাসনের আশা, এই প্রচার অভিযান সাধারণ মানুষের অভাব দূর করতে এক বড়সড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে।