সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে পা দিতে চলেছে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। অথচ উৎসবের আবহের মাঝেই বইপাড়ায় জোরালো হয়েছে এক নতুন বিতর্ক। বইমেলার ভবিষ্যৎ চরিত্র কি থাকবে আন্তর্জাতিকতার ভিত্তিতে, নাকি গুরুত্ব পাবে ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়? এই প্রশ্নকে ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনা।
নবনির্বাচিত রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আদলে কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়াকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এরই মধ্যে প্রকাশনা জগতে জল্পনা, সুবর্ণজয়ন্তীর কলকাতা বইমেলার আয়োজন এবং পরিচালনা নিয়েও বড় পরিবর্তনের ভাবনা চলছে।
প্রকাশনা জগতের একাংশের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে বইমেলার সাংস্কৃতিক চরিত্রের বদলে রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ বেড়েছে। সরকারি স্টল, নির্দিষ্ট প্রকাশকদের প্রাধান্য এবং সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে বইমেলার অতিরিক্ত সংযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠেছে। স্কুলে বই কেনার সরকারি বরাদ্দ নিয়েও স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক প্রকাশক।
এই আবহেই আবার সক্রিয় হয়েছে বঙ্গীয় গ্রন্থ শিল্প পরিষদ। সম্প্রতি সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, বইমেলায় মত প্রকাশের আরও বড় পরিসর তৈরি হওয়া উচিত এবং ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সংস্থার অন্যতম মুখ ও আইনজীবী দেবজিৎ সরকার দাবি করেন, দীর্ঘদিন একটি সংগঠনের হাতে আয়োজন থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়। তাঁর মতে, বইপাড়ায় একাধিক প্রকাশক সংগঠন রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে বইমেলার আয়োজনে বৃহত্তর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত এবং সরকার নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করুক।
অন্যদিকে, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ড এই দাবিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেন, আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার বর্তমান মর্যাদা একদিনে তৈরি হয়নি। কয়েক দশকের ধারাবাহিক পরিশ্রম, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং প্রকাশনা জগতের সহযোগিতার ফলেই কলকাতা আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বইমেলার শহর।
তাঁর বক্তব্য, "সবাই মিলে বইমেলা" করার ধারণা বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও বিবেচনা করা দরকার। আয়োজনের ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে কলকাতা বইমেলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অবাণিজ্যিক বইমেলায় পরিণত হয়েছে। ১৯৯৫ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সহযোগিতায় গিল্ড নিয়মিত এই মেলার আয়োজন করছে। সুবর্ণজয়ন্তীর ৫০তম সংস্করণে অতিথি দেশ (Guest of Honour) হিসেবে আমেরিকার অংশগ্রহণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে প্রকাশনা জগতের একাংশের মতে, বইমেলাকে অতীতের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা যেমন জরুরি, তেমনই নতুন কোনও রাজনৈতিক বা আদর্শগত প্রভাবও আন্তর্জাতিক চরিত্রকে ছাপিয়ে গেলে তা বাংলা প্রকাশনা শিল্পের পক্ষে শুভ হবে না।
সুবর্ণজয়ন্তীর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন একটাই—কলকাতা বইমেলা কি তার আন্তর্জাতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখবে, নাকি নতুন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে? আগামী কয়েক মাসেই মিলতে পারে সেই উত্তর।