রাজ্য

জ্যোতি বসুর ১১৪তম জন্মবার্ষিকী: পরিমিতিবোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক আভিজাত্যের এক অনন্য অধ্যায়

‘দাদা’ নন, তিনি ছিলেন ‘জ্যোতি বাবু’— ভারতীয় রাজনীতিতে সংযম, প্রশাসনিক ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের বিরল উদাহরণকে স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শেয়ার
X WhatsApp

ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের প্রভাব কেবল একটি রাজ্য বা দলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁরা হয়ে ওঠেন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক শালীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী Jyoti Basu ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের অন্যতম।

তাঁর ১১৪তম জন্মবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যায় এমন এক রাজনৈতিক নেতাকে, যিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও ব্যক্তিত্বের আভিজাত্য, পরিমিতিবোধ এবং প্রশাসনিক সংযমকে নিজের পরিচয়ের অংশ করে তুলেছিলেন।

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান

১৯৯২ সালে Babri Masjid Demolition-এর পর যখন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, তখন পশ্চিমবঙ্গ তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। এক সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার Javed Akhtar প্রশ্ন করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে দাঙ্গা হয় না কেন? জ্যোতি বসুর সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল— “কারণ প্রশাসন তা চায় না।”

মাত্র কয়েকটি শব্দে প্রশাসনের দায়িত্ব ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার গুরুত্বকে তুলে ধরেছিলেন তিনি। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আজও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয়।

‘দাদা’ নয়, কেন ‘জ্যোতি বাবু’?

বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বহু নেতাকে ‘দাদা’ সম্বোধনে ডাকা হলেও জ্যোতি বসুর ক্ষেত্রে সেই চিত্র ছিল আলাদা। তিনি ছিলেন ‘জ্যোতি বাবু’। রাজনীতিকে জনপ্রিয়তার প্রদর্শনীতে পরিণত না করে তিনি ব্যক্তিগত মর্যাদা ও রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন।

জনসংযোগের চেনা কৌশল, জনতার সঙ্গে অতিরিক্ত মেলামেশা কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচারের পথে তিনি হাঁটেননি। ফলে সমর্থক থেকে সমালোচক— সকলের কাছেই তিনি ছিলেন একজন সংযত ও আভিজাত্যপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

ভূমি সংস্কার ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার রূপকার

১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর পশ্চিমবঙ্গে ভূমি সংস্কার কর্মসূচি তাঁর সরকারের অন্যতম বড় পদক্ষেপ হয়ে ওঠে। লক্ষাধিক প্রান্তিক কৃষকের হাতে জমির অধিকার পৌঁছে দেওয়া হয়।

এর পাশাপাশি ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষমতা স্থানীয় মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ ভারতীয় বিকেন্দ্রীকরণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

শিল্প, উন্নয়ন ও প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি

জ্যোতি বসুর কম্পিউটারায়ন নিয়ে সতর্ক অবস্থান দীর্ঘদিন বিতর্কের বিষয় ছিল। তবে তাঁর উদ্বেগের মূল কেন্দ্র ছিল প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব।

আজ যখন বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও অটোমেশন নিয়ে কর্মসংস্থানের প্রশ্ন নতুন করে উঠে আসছে, তখন তাঁর সেই সতর্কবার্তা অনেকের কাছেই নতুন অর্থে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

কোয়ালিশন রাজনীতির সফল স্থপতি

ভারতের জোট রাজনীতির ইতিহাসে জ্যোতি বসুর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শরিকদের নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ সমন্বয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসন ও দলের সীমারেখা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁর যে পরিমিতিবোধ ছিল, তা বর্তমান সময়ের রাজনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয়।

‘ঐতিহাসিক ভুল’ এবং প্রধানমন্ত্রিত্বের অধ্যায়

১৯৯৬ সালে দেশের বিভিন্ন বিজেপি-বিরোধী রাজনৈতিক দল তাঁকে প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে চাইলেও তাঁর দল অনুমোদন দেয়নি। পরে এই সিদ্ধান্তকে বাম রাজনীতির ইতিহাসে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে দলীয় সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি যে রাজনৈতিক শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা ভারতীয় গণতন্ত্রে এক বিরল নজির হিসেবেই বিবেচিত হয়।

এক অনন্য রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে থাকা, প্রশাসনিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক পরিমিতিবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া— এই তিন বৈশিষ্ট্যই জ্যোতি বসুকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।

১১৪তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে স্মরণ করা, যেখানে ব্যক্তিত্বের আভিজাত্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং প্রশাসনিক সংযম সমান গুরুত্ব পেয়েছিল।

KOLOROB Note

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে আমাদের Contact পৃষ্ঠার মাধ্যমে জানান। যাচাই শেষে সংশোধনী প্রকাশ করা হবে।

সম্পর্কিত খবর আরও →
বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ-খুন তদন্তে ‘জয়নগর মডেল’? ২০২৪-এর মামলার তদন্তকারী অফিসারদের ফের মাঠে নামানোর প্রস্তুতি
রাজ্য

বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ-খুন তদন্তে ‘জয়নগর মডেল’? ২০২৪-এর মামলার তদন্তকারী অফিসারদের ফের মাঠে নামানোর প্রস্তুতি

এসআইআরের পর এবার জনগণনাতেও শিক্ষকরা! প্রধান শিক্ষক-সহ সিনিয়র শিক্ষকদের নতুন দায়িত্বে প্রশ্নের মুখে স্কুলের পঠনপাঠন
রাজ্য

এসআইআরের পর এবার জনগণনাতেও শিক্ষকরা! প্রধান শিক্ষক-সহ সিনিয়র শিক্ষকদের নতুন দায়িত্বে প্রশ্নের মুখে স্কুলের পঠনপাঠন

বারুইপুর কাণ্ডে কড়া প্রশাসন, যে ঘটনাটি ঘটেছে তাতে জিরো টলারেন্স।বড় অ্যাকশন হবে। আমি কাল নিজে যাচ্ছি বারুইপুর সুপারের অফিসে। অশান্তির নেপথ্যে থাকা শক্তিকে তীব্র হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর
রাজ্য

বারুইপুর কাণ্ডে কড়া প্রশাসন, যে ঘটনাটি ঘটেছে তাতে জিরো টলারেন্স।বড় অ্যাকশন হবে। আমি কাল নিজে যাচ্ছি বারুইপুর সুপারের অফিসে। অশান্তির নেপথ্যে থাকা শক্তিকে তীব্র হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর

ছবি  এ আই দ্বারা নির্মিত এবং নিজস্ব
রাজ্য

উত্তরবঙ্গের চা শ্রমিকদের জন্য ৩১৩ কোটির মেগা প্রকল্প, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থানে বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর