রাজ্যপাট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামোর পাশাপাশি এবার বদলাতে শুরু করল রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক ভবনের বাহ্যিক রূপও। দীর্ঘ পনেরো বছর ধরে চলা চেনা ছক থেকে বেরিয়ে এসে নতুন সরকার যে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটতে চলেছে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে রাজ্যের প্রতিটি স্তরে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানার তুলনায় বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে অনেক বেশি সময় নবান্নে কাটাচ্ছেন এবং প্রশাসনিক কাজে গভীরভাবে মনোনিবেশ করছেন, তা ইতিমধ্যেই ওয়াকিবহাল মহলের নজরে এসেছে। সরকারি ফাইল দ্রুত নিকাশি থেকে শুরু করে বর্তমান সরকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে দিল্লির সঙ্গে সমন্বয় রক্ষার কাজ—সবটাই এগোচ্ছে রকেট গতিতে।
দীর্ঘদিনের লাল ফিতের ফাঁস কাটিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে এই দ্রুততার মাঝেই এবার শুরু হয়ে গেল রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্নের বহু চর্চিত রঙ বদলের পালা।
মঙ্গলবার এক বিশেষ শুভক্ষণ বা 'অমৃতযোগ' মেনেই রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক ভবনে গেরুয়া রঙের প্রথম প্রলেপ পড়ল। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, গোটা নবান্ন ভবনটিকে গেরুয়া এবং সাদা রঙে রাঙিয়ে তোলার এক সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও পূর্ত দফতরের তরফ থেকে মূল ভবনটিতে রঙ করার জন্য এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক দরপত্র বা টেন্ডার ডাকা হয়নি, তবে নবান্ন সভাগৃহে গেরুয়া ও সাদা রঙ লাগানোর কাজ ইতিমধ্যেই জোরকদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। জানা যাচ্ছে, খুব শীঘ্রই পুরো দস্তুর দরপত্র ডেকে ভবনের বাইরের অংশেও এই নতুন রঙের প্রলেপ দেওয়া হবে। এই পদক্ষেপ ঘিরেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা এবং কৌতূহল শুরু হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে প্রশাসনিক ভবনকে ইচ্ছামতো কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা নেতানেত্রীর পছন্দের রঙে রাঙিয়ে দেওয়ার খুব একটা চল অতীতে কখনই ছিল না। ভারতের বেশ কিছু প্রাচীন বা ঐতিহাসিক শহরে নির্দিষ্ট রঙের ব্যবহার দেখা যায় ঠিকই, তবে তার পিছনে মূলত সেখানকার নিজস্ব দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার তাগিদ থাকে। উদাহরণস্বরূপ রাজস্থানের জয়পুরের কথা বলা যেতে পারে, যাকে তার ঐতিহ্যের কারণে 'গোলাপি শহর' বা পিঙ্ক সিটি বলা হয়। যদিও আধুনিকতার প্রবল আগ্রাসনে রাজপুতানার সেই পুরনো শহরের ঐতিহ্যও আজ কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে এসেছে।
কিন্তু বাংলায় এই নীল-সাদা রঙের প্রবর্তনের নেপথ্যে অন্য ইতিহাস রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের একেবারে শুরুর দিকেই রাজ্য জুড়ে এই নির্দিষ্ট রঙের আচমকা আত্মপ্রকাশ ঘটে। তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীকের সঙ্গে নীল-সাদা রঙের কোনও সরাসরি বা পরোক্ষ যোগ না থাকলেও, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর চিরপরিচিত নীল পাড় সাদা শাড়ির সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই এই রঙ বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলের দৃঢ় ধারণা। সেই সময়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শুধু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বা প্রশাসনিক ভবনই নয়; সমস্ত বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাভাবনা, বাস্তব উপযোগিতা এবং ট্রাফিক নিয়ম-নীতিকে একপ্রকার শিকেয় তুলে রাস্তার রোড ডিভাইডার থেকে শুরু করে ফ্লাইওভার—সবকিছুর রঙই নীল-সাদা করে দেওয়া হয়েছিল। 'কর্তার ইচ্ছা' বা বলা ভালো তৎকালীন দলনেত্রীর একচেটিয়া পছন্দের কারণে সেই সময়ে প্রশাসনের অন্দরেও কেউ এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে বিন্দুমাত্র আপত্তি তোলার সাহস দেখাতে পারেননি।
তবে বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেস বাংলার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতেই নবান্নে শুরু হয়েছে এক সম্পূর্ণ উলটপুরাণ। দীর্ঘদিনের চেনা নীল-সাদা ছবি বদলে গিয়ে সেখানে ধাপে ধাপে জায়গা করে নিচ্ছে গেরুয়া ও সাদা রং। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ এবং ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ তাঁদের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করেছেন। স্থাপত্য ও প্রশাসনিক রীতিনীতি সংক্রান্ত এক বিশেষজ্ঞ এই বদল প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, "নবান্নের নীল-সাদা রঙ আমজনতার চোখ-সওয়া হয়ে গেলেও, একটি রাজ্যের প্রধান সচিবালয় হিসেবে তার মধ্যে পেশাদারি ভাবের যথেষ্ট অভাব ছিল। তবে নীল-সাদা মুছে এখন যে গেরুয়া ও সাদা রঙ করা শুরু হলো, তা-ই বা দেখতে কতটা ভালো লাগবে, তা নিয়েও আমাদের মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।"
প্রশাসনিক ভবনের গাম্ভীর্য ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করে তিনি আরও বলেন, "প্রশাসনিক ভবনকে রাজনৈতিক রঙে না রাঙিয়ে এমনভাবে রঙ করা উচিত যাতে তা বাস্তবেই একটি নিরপেক্ষ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ সচিবালয়ের চেহারা পায়।" সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের এই কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি নবান্নের এই বাহ্যিক রূপান্তর আগামী দিনে কতটা গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, এখন সেটাই দেখার।