শিল্পে জোয়ার বাংলায়! ৬০০ কোটির আমূল মেগা প্ল্যান্টে সাঁকরাইল থেকে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত
দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসরে নানা বিতর্ক চলেছে। সেই প্রেক্ষাপটে রাজ্যের শিল্প মানচিত্রে নতুন সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদক সংস্থা আমূলের মেগা বিনিয়োগ প্রকল্প। হাওড়ার সাঁকরাইল ফুড পার্কে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠতে চলেছে অত্যাধুনিক ডেয়ারি প্রসেসিং প্ল্যান্ট, যা রাজ্যের শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, আগামী ১৩ জুন এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে। ভূমিপুজোর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রী Suvendu Adhikari-র। পাশাপাশি উপস্থিত থাকবেন Amul-এর শীর্ষ আধিকারিকরাও। রাজ্যে আমূলের নিজস্ব মালিকানাধীন এটি প্রথম বৃহৎ ডেয়ারি প্রসেসিং ইউনিট হতে চলেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম দই উৎপাদন কেন্দ্রের লক্ষ্য
এই প্রকল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল এর উৎপাদন ক্ষমতা। সরকারি সূত্রের দাবি, সাঁকরাইলের এই অত্যাধুনিক কারখানায় বিশ্বের বৃহত্তম দই উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১০ লক্ষ কিলোগ্রাম দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে এই প্ল্যান্টে।
উৎপাদিত পণ্যের তালিকায় থাকবে দই, মিষ্টি দই, ইয়োগার্ট, লস্যি, ঘোল এবং অন্যান্য মূল্য সংযোজিত দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্য। ফলে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারেও এই ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ধরনের বৃহৎ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প শুধুমাত্র উৎপাদন ক্ষেত্রেই নয়, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিবহণ, বিপণন, প্যাকেজিং এবং কৃষি-সহযোগী শিল্পেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে।
দুধ সংগ্রহ থেকে শুরু করে কোল্ড-চেইন নেটওয়ার্ক, লজিস্টিকস এবং খুচরো বাজার পর্যন্ত একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হবে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
নবান্নে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
সম্প্রতি নবান্নে এই প্রকল্প ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আমূল পরিচালনাকারী Kaira District Cooperative Milk Producers' Union-এর প্রধান অমিত ব্যাস এবং Gujarat Cooperative Milk Marketing Federation-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর জায়েন মেহতা।
বৈঠকে ডেয়ারি শিল্পের সম্প্রসারণ, কৃষকদের সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি, কাঁচামাল সংগ্রহ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
শুধু সাঁকরাইল নয়, রাজ্যজুড়ে শিল্পায়নের পরিকল্পনা
রাজ্য সরকারের দাবি, শিল্প বিনিয়োগের এই ধারা শুধুমাত্র হাওড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা-সহ রাজ্যের একাধিক এলাকায় নতুন শিল্প প্রকল্পের পরিকল্পনা চলছে।
কৃষিজ বিপণন দফতরের তরফে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু সম্ভাব্য প্রকল্পের জন্য জমি চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর তরফে বিনিয়োগ আগ্রহও ক্রমশ বাড়ছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি।
শিল্পবান্ধব বার্তা দিতে তৎপর সরকার
শিল্প বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করতে সম্প্রতি দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো সংস্থা Larsen & Toubro-র চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর S. N. Subrahmanyan-এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী।
সেই বৈঠকে শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়ন, বৃহৎ বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সরকারের বক্তব্য, আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
বাংলার অর্থনীতিতে নতুন মোড়?
রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, শিল্পায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে কৃষি ও পরিষেবা খাতের পাশাপাশি উৎপাদনশীল শিল্পক্ষেত্রেও নতুন গতি আসতে পারে।
সাঁকরাইলের আমূল প্রকল্প সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, কৃষক সংযোগ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প—সব দিক থেকেই এই প্রকল্প আগামী দিনের বাংলার অর্থনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।