মহারাষ্ট্রে শাসকপক্ষকে ভেঙে নতুন দল তৈরি করে ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করেছিল বিজেপি। এবার প্রায় একই কায়দায় বাংলায় বিরোধীপক্ষে আড়াআড়ি বিভাজন তৈরি করে শুধু মূল বিরোধী শক্তির শিরদাঁড়া ভাঙাই নয়, অন্য বিরোধীদেরও বিশেষ বার্তা দিল পরিবর্তনের বিজেপি সরকার। পরিস্থিতির এমনই পরিহাস যে তৃণমূলের জন্মদাত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই 'নব্য তৃণমূল'-এর মুখ্য পরামর্শদাতা হওয়ার জন্য "অফার" করলেন মমতার হাত ধরেই সিপিআইএম থেকে তৃণমূলে এসে রাজ্যসভা সাংসদ, ট্রেড ইউনিয়ন সভাপতি ও প্রথমবার বিধায়ক হওয়া "নব্য" তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
আসলে ভোটের ফলাফল সামনে আসতেই তৃণমূলের ভিতরে আড়াআড়ি বিভাজন স্পষ্ট হয়েছিল। পরিষদীয় দলনেতা কে হবেন তা নিয়ে দলীয় বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বাধিনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশ সেই আগুনে ঘি ঢালে। বৈঠকে যারা বিদ্রোহী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তাদের মধ্যে অন্যতম ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহা, শিউলি সাহা ও অন্যান্যরাও। বলাই বাহুল্য, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একদিকে দুর্নীতি, অপরাধকে সামনে রেখে সামাজিক ও আইনিভাবে তৃণমূলের 'টার্গেট' নেতাদের বেআইনি কাজকর্ম প্রকাশ্যে এনে রাজনৈতিক ময়দান থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া এবং একইসঙ্গে দলের অভ্যন্তরে ভাঙন ধরিয়ে তৃণমূলকে আরও কোণঠাসা করতে তৎপর হয় শাসক বিজেপি। পাশাপাশি তৃণমূল নেত্রীর রাজ্যের বিজেপি বিরোধী সব দলকে এক ছাতার তলায় আনার আবেদন এবং সর্বভারতীয় স্তরে ইন্ডিয়া বৈঠকে যোগ দেওয়ার প্রাক্কালে তৃণমূলকে আরও বেশি শক্তিহীন করার কৌশল হাতছাড়া করতে নারাজ বিজেপি। পাশাপাশি রাজ্যের অন্যান্য বিরোধী পক্ষকে বিশেষ বার্তা দিতে মহারাষ্ট্র মডেলে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তিকে ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মত। মহারাষ্ট্রে যেমন একনাথ শিন্ডে এ ব্যাপারে কার্যকরী ভূমিকা নিয়েছিলেন এ রাজ্যে সেই ভূমিকা পালন করেছেন প্রাক্তন বামপন্থী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা পর থেকে তৃণমূল নেতৃত্ব যেভাবে ঘরবন্দি হয়ে পড়েছিলেন সেই সুযোগে হকার পুনর্বাসনের ইস্যুকে সামনে রেখে বাংলার রাজনীতিতে ফের প্রাসঙ্গিক হওয়ার উদ্যোগী হয় বিধানসভায় ফের খাতা খোলা রাজ্যের প্রাক্তন শাসক বামপন্থীরাও। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, প্রাক্তন বামপন্থী সাংসদ তথা ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাধ্যমে তৃণমূল ভাঙার কাজ ত্বরান্বিত করে পরোক্ষে বামপন্থীদেরও বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছে রাজ্যে পরিবর্তনের শাসকপক্ষ। মঙ্গলবার শুভেন্দু অধিকারীর ঝটিতি দিল্লি সফর এই বিশেষ পরিকল্পনার অঙ্গ বলেও রাজনৈতিক সূত্রে জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বুধবার নজিরবিহীনভাবে রাজ্য বিধানসভায় প্রধান বিরোধী দল তৃণমূলের জয়ী ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন (বাইরে থাকা আরও দুজন বিধায়কও সম্মতি জানিয়েছেন) পরিষদীয় দলের নেতা বা বিরোধী দলনেতা ও মুখ্য সচেতক নির্বাচন করে অধ্যক্ষের কাছে নিজেদের প্রধান বিরোধী শক্তির মর্যাদা দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। সেখানে বিরোধি দলনেতা নির্বাচিত হয়েছেন উলুবেড়িয়ার বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুখ্য সচেতক হয়েছেন রঘুনাথগঞ্জের বিধায়ক আখরুজ্জমান। এর আগে দলীয়ভাবে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা নির্বাচিত করে অধ্যক্ষকে চিঠি দিলেও সেই চিঠি শুধু বিধানসভার নীতিবিরুদ্ধই নয় বিধায়কদের সই জালিয়াতির বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসে। এই ইস্যুকে সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যাযয়ের উপরে আস্থা দেখিয়েও অভিষেক বিরোধী বিদ্রোহ তুঙ্গে তুলে দুই তৃতীয়াংশের বেশি জোড়াফুল বিধায়ক 'নব্য' তৃণমূলের জন্ম দিয়েছেন এবং নিজেদেরকে "আসল তৃণমূল" বলেও পরিচয় দিয়েছেন। নব্য তৃণমূলীদের মতে "মমতার তৃণমূল আজ মমতার হাতছাড়া। হাইজ্যাক করেছে অভিষেক ও তাঁর কর্পোরেট সংস্থা। মা মাটি মানুষের সংযোগ ছেড়ে কর্পোরেট সংস্থার দলে পরিণত। দলনেত্রীর সিদ্ধান্ত সেখানে গুরুত্বহীন হয়ে কর্পোরেট সংস্থার (পড়ুন অভিষেকের) সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলে গণ্য হয়। সংসদীয় বা পরিষদীয় দলেও দলনেত্রীর সিদ্ধান্ত গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।" কার্যত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে 'নব্য' তৃণমূলের নেতা ঋতব্রতর বক্তব্য, "সংগঠনে শুধু সং আছে, কোনও গঠন নেই। আর কাজের দায়িত্ব ভাগ করতে কিছু পদ তৈরি হলেও তৃণমূল পরিষদীয় দলে কোনও নেতা নেই। পুরোটাই একটা টিমগেম।" তেমনি সন্দীপন সাহার বক্তব্য " পরিষদীয় দলের সঙ্গে অভিষেকের দূর-দূরান্তের কোনও সম্পর্ক নেই। তা সত্ত্বেও তাঁর এই মাতব্বরি কেউ মানছি না।" দলের দীর্ঘদিনের সঙ্গী অথচ গত পাঁচ বছর ধরে বিধানসভায় একদিনও কিছু বলার সুযোগ না পাওয়া কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা জানান " যে নেতা-কর্মীরা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছিল তাদেরই কোনও দাম ছিল না দলে। অভিষেক স্নেহে অন্ধ হয়ে দিদিও ব্রাত্য করেছিলেন তাঁদের। এই অন্ধ স্নেহ দলের ক্ষতি করছে জেনেও প্রশ্রয় দিয়েছেন কেন তা জানি না। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি পুর্ণ আস্থা জানিয়ে বলি আপনি আমাদের পথপ্রদর্শক থাকুন, কিন্তু স্নেহে অন্ধ হয়ে ভাবনা বন্ধ করুন। অন্তত ভাবা প্র্যাকটিস করুন।"
একইসঙ্গে অভিষেকের উদ্যোগে রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য যে সই জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে তা সংসদে তুলে ধরে লোকসভা স্পিকার তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন এই আবেদনও জানাতে পারে "নব্য" তৃণমূল। একই দাবিতে আসন্ন বিধানসভা অধিবেশনে সোচ্চার হতে পারে বিজেপি পরিষদীয় দলও। ফলে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে অভিষেককে কোণঠাসা করে তৃণমূলনেত্রীকেও বিশেষ বার্তা দিতে চায় 'নব্য' তৃণমূল। আর এক ঢিলে অনেক পাখি মেরে রাজ্যে প্রধান বিরোধী শক্তিকে দুরমুশ করার সুযোগ হাতছাড়া করতে নারাজ বঙ্গের শাসকপক্ষও।