অন্ধ্রপ্রদেশের রেকর্ড ভেঙে গিনেস বুকে নাম তোলা লক্ষ্য, যোগ দিবসের রণকৌশল তৈরিতে নবান্নে হাই-প্রোফাইল বৈঠক
কলকাতা

অন্ধ্রপ্রদেশের রেকর্ড ভেঙে গিনেস বুকে নাম তোলা লক্ষ্য, যোগ দিবসের রণকৌশল তৈরিতে নবান্নে হাই-প্রোফাইল বৈঠক

আসন্ন ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবসকে কেন্দ্র করে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে তিলোত্তমা কলকাতা।

শেয়ার
X WhatsApp

আসন্ন ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবসকে কেন্দ্র করে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে তিলোত্তমা কলকাতা। কেবল প্রথাগত উদযাপনের গণ্ডিতে না রেখে, এবার গঙ্গার তীরবর্তী ঘাটগুলিতে এক বিশাল মানব-সমাবেশের মাধ্যমে ‘গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে’ নাম তোলাই এখন রাজ্যের প্রধান লক্ষ্য। এই মেগা ইভেন্টের মধ্য দিয়ে যোগ ব্যায়ামের বৃহত্তম জমায়েতের নিরিখে অন্ধ্রপ্রদেশের পুরনো রেকর্ডকে পেছনে ফেলে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন কীর্তি স্থাপন করতে চাইছে পশ্চিমবঙ্গ। এই বিশাল কর্মসূচির ব্লু-প্রিন্ট বা রূপরেখা চূড়ান্ত করতে মঙ্গলবার বিকেল ঠিক ৫টায় নবান্ন সভাঘরে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান তথা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকটি সম্পন্ন হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে কলকাতায় থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কীভাবে এই সুবিশাল শিবিরের আয়োজন করা সম্ভব, কোন কোন ঘাট ও ভেন্যুকে মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে এবং সেখানে আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে— তা নিয়েই মূলত বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এই বৈঠকে। একই সঙ্গে ওই বিশেষ দিনে মহানগরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, security বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্য রাজনীতিতে রাজনৈতিক সমীকরণের ভাঙা-গড়ার আবহে সম্পূর্ণ প্রশাসনিক ও সামাজিক এই মেগা কর্মসূচিকে সফল করতে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর এই বাড়তি তৎপরতাকে অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা এই জরুরি পর্যালোচনা বৈঠকে রাজ্যের একঝাঁক শীর্ষ আমলা ও আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার নিখুঁত ছক তৈরি করতে বৈঠকে যোগ দেন রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক (ডিজিপি) সিদ্ধার্থ নাথ গুপ্ত এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় কুমার নন্দ। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কলকাতা পুরসভার কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে, আবগারি কমিশনার এবং পিডব্লিউডি সচিব অন্তরা আচার্য। আমন্ত্রিতদের তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সেচ ও জলপথ দফতরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব ডঃ কৃষ্ণ গুপ্ত, পর্যটন দফতরের বরুণ কুমার রায়, মৎস্য ও পরিবেশ দফতরের রশ্নি সেন, অর্থ দফতরের প্রভাত কুমার মিশ্র, বন দফতরের মনীশ জৈন, স্কুল ও উচ্চশিক্ষা দফতরের বিনোদ কুমার, ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ দফতরের প্রধান সচিব রাজেশ কুমার সিনহা এবং স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রধান সচিব সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ সহ পূর্ত, পরিবহন, কৃষি ও উপজাতি উন্নয়ন দফতরের শীর্ষ আধিকারিকরা।
কলকাতায় যোগ দিবসকে একটি সর্বজনীন আন্দোলন এবং বিশ্বের বৃহত্তম যোগ ইভেন্টে পরিণত করার জন্য রাজ্য জুড়ে থাকা সমস্ত যুব ক্লাবকে এই মিশনের সাথে যুক্ত করার এক অভিনব মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হয়েছে। স্থির হয়েছে, পাড়ায় পাড়ায় এবং ব্লকে ব্লকে থাকা সক্রিয় যুব ক্লাবগুলিই হবে এই মেগা ইভেন্টের প্রধান চালিকাশক্তি বা মূল সংযোগস্থল। এই ক্লাবগুলির মাধ্যমে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এবং সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে এই যোগ উৎসবে শামিল করা হবে। যুব সমাজকে এই স্বাস্থ্য আন্দোলনের সামনের সারিতে এনে অন্ধ্রপ্রদেশের রেকর্ড ভাঙার চ্যালেঞ্জ নিয়েছে কলকাতা।
অন্য দিকে, পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষা দফতরের অন্তর্গত 'পশ্চিমবঙ্গ সমগ্র শিক্ষা মিশন' ৭ জুন থেকে ২১ জুন পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে স্কুল স্তরে একগুচ্ছ বিশেষ প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের নির্দেশিকা জারি করেছে। সূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকেই মালদহ ও দুই দিনাজপুরের স্কুলগুলিতে 'যোগা ইন স্কুলস ডে' পালনের মাধ্যমে এই কর্মযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ১০ জুন উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া এবং হুগলিতে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ যোগাভ্যাস, ১২ জুন ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহল তথা উপজাতি প্রধান এলাকায় 'যোগা ফর ট্রাইবাল বেঙ্গল' এবং ১৩ জুন সংশ্লিষ্ট জেলাগুলির চা-বাগান এলাকায় প্রবীণ নাগরিক ও চা-শ্রমিকদের জন্য বিশেষ যোগ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে।
রেকর্ড গড়ার এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে আগামী ১৪ জুন রাজ্যের সমস্ত জেলায় একটি নির্দিষ্ট টোল-ফ্রি নম্বরে (১৮০০-৩১৫-৭০০৮) মিসড কল দিয়ে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের লক্ষ্যে নাম নথিভুক্তকরণের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী ধাপ হিসেবে ১৫ জুন 'যোগা সঙ্গম ডে' উপলক্ষে হাওড়া ব্রিজ, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, সুন্দরবন, কোচবিহার এবং মুর্শিদাবাদের মতো রাজ্যের আইকনিক ও ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে স্কুল পড়ুয়া, শিক্ষক ও নোডাল অফিসারদের উপস্থিতিতে বিশেষ যোগা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর ১৯ জুন রাজ্যের প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসন ও ক্রীড়া দফতরের যৌথ উদ্যোগে গণসচেতনতা বাড়াতে আয়োজিত হবে 'রান ফর যোগা'। সব শেষে, ২১ জুন মূল আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে সমস্ত জেলার নির্ধারিত ভেন্যুগুলিতে পড়ুয়া ও নোডাল অফিসারদের সময়মতো উপস্থিতি, পুষ্টিকর 'আয়ুষ আহার' বণ্টন এবং সম্পূর্ণ শৃঙ্খলা ও সুরক্ষার সাথে মূল অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যোগ ব্যায়ামের এই বিশ্বরেকর্ড গড়ার জন্য কলকাতার ঐতিহাসিক গঙ্গার তীর ও ঘাটগুলিকেই প্রধান মঞ্চ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। গঙ্গার পবিত্র বাতাস এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার মানুষের এই যৌথ যোগাসন প্রদর্শনী বিশ্বমঞ্চে এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা করবে বলেই আশা প্রকাশ করছে প্রশাসন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই মেগা ইভেন্টটিকে সফল করতে রাজ্য প্রশাসনের পাশাপাশি কেন্দ্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকেও এই কর্মযজ্ঞে সরাসরি শামিল করেছে নবান্ন। পূর্ব রেলওয়ে, দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ে এবং কলকাতা মেট্রো রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজারদের এই বৈঠকে প্রতিনিধি পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে ওই দিন দূরদূরান্ত থেকে আসা লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াত মসৃণ ও নির্বিঘ্ন করা যায়। পাশাপাশি, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ, ইস্টার্ন এয়ার কমান্ডের এয়ার অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ এবং নৌবাহিনীর পশ্চিমবঙ্গ শাখার ইন-চার্জকেও এই ঐতিহাসিক কর্মসূচির প্রস্তুতি বৈঠকে সহযোগী করা হয়েছে। এছাড়াও সিআরপিএফ, সিআইএসএফ, বিএসএফ এবং এসএসবি-র মতো আধাসামরিক বাহিনীর আইজি-রা ছাড়াও এনডিআরএফ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী পোর্ট কর্তৃপক্ষকেও এই বৃহৎ সমন্বয় বৈঠকের অংশ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, ২১ জুনের এই গিনেস রেকর্ড গড়ার লড়াই কেবল একটি সাধারণ শরীরচর্চার অনুষ্ঠান হয়ে থাকছে না, বরং অন্ধ্রপ্রদেশকে টেক্কা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলার শ্রেষ্ঠত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার এক মহা অগ্নিপরীক্ষার রূপ নিতে চলেছে।

KOLOROB Note

এই প্রতিবেদনে কোনো তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে আমাদের Contact পৃষ্ঠার মাধ্যমে জানান। যাচাই শেষে সংশোধনী প্রকাশ করা হবে।

সম্পর্কিত খবর আরও →
পুলিশ প্রশাসনের পর এবার নবান্নে আমলা স্তরে বড়সড় রদবদল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর
কলকাতা

পুলিশ প্রশাসনের পর এবার নবান্নে আমলা স্তরে বড়সড় রদবদল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

নীল-সাদার যুগ পেরিয়ে রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক ভবনে এবার গেরুয়ার ছোঁয়া, কর্মসংস্কৃতির সঙ্গেই বদলাচ্ছে রঙের চেনা ছবি
কলকাতা

নীল-সাদার যুগ পেরিয়ে রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক ভবনে এবার গেরুয়ার ছোঁয়া, কর্মসংস্কৃতির সঙ্গেই বদলাচ্ছে রঙের চেনা ছবি

উৎসবের ডিউটির স্বীকৃতি, পুলিশ ও হোমগার্ডদের জন্য অতিরিক্ত ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা নবান্নের
কলকাতা

উৎসবের ডিউটির স্বীকৃতি, পুলিশ ও হোমগার্ডদের জন্য অতিরিক্ত ১০ দিনের ছুটি ঘোষণা নবান্নের

রাজ্যে সিবিআই তদন্তে আর নেই প্রশাসনিক বাধা, ‘সাধারণ সম্মতি’ ফিরিয়ে দিল নয়া সরকার
কলকাতা

রাজ্যে সিবিআই তদন্তে আর নেই প্রশাসনিক বাধা, ‘সাধারণ সম্মতি’ ফিরিয়ে দিল নয়া সরকার