রাজ্যে জনগণনা প্রক্রিয়া শুরুর আগে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে জনবিন্যাসের পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার নবান্নে অনুষ্ঠিত ‘প্রিন্সিপাল সেন্সাস অফিসার্স কনফারেন্স’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে জনগণনার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রাজ্যের দীর্ঘ বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় অতীতে পর্যাপ্ত বেড়া না থাকা এবং সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে জমি না দেওয়ার ফলে জনবিন্যাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে বলে তাঁর অভিযোগ।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। তাঁর দাবি, সীমান্তবর্তী এলাকায় বহু মানুষের বসবাস শুরু হয়েছে, যাঁরা ভারতীয় নাগরিক নন। জনগণনার সময় প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্য জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের সমস্যা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, জনগণনার চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশিত হলে রাজ্য ও দেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তা সহায়ক হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এই তথ্যভাণ্ডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে তিনি জানান।
জনগণনা সফল করতে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণেরও আবেদন জানান মুখ্যমন্ত্রী। জনগণনা সংক্রান্ত তথ্য ও অভিযোগ জানানোর জন্য দেশজুড়ে ২৪ ঘণ্টার টোল-ফ্রি নম্বর ১৮৫৫ চালু করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে জনগণনা পরিচালন দফতরের ল্যান্ডলাইন নম্বর ০৩৩-২৩৩৫-৯৫০৩। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গ জনগণনা দফতরের ওয়েবসাইট থেকেও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
এদিন সম্মেলনে রাজ্যের জনগণনা অধিকর্তা ডঃ রশ্মী কমল জানান, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে জনগণনা হতে চলেছে। পাশাপাশি প্রথমবার সাধারণ মানুষের জন্য চালু করা হচ্ছে স্ব-গণনা বা ‘সেলফ-এনুমেরেশন’-এর সুযোগ।
ডঃ কমল জানান, জনগণনা পরিচালনার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকার ১৬ জুন ২০২৫ সালে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে সেই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে ১১ মে ২০২৬-এ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জনগণনার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ হবে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে। জনগণনার রেফারেন্স ডেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১ মার্চ ২০২৭।
জনগণনা অভিযানের জন্য ‘বিকাশ’ এবং ‘প্রগতি’ নামে দুটি মাসকটও প্রকাশ করা হয়েছে। প্রচার ও সচেতনতা কর্মসূচিতে এই দুই মাসকট ব্যবহার করা হবে বলে জানান তিনি।
ডঃ কমলের কথায়, এবারের জনগণনা দু’টি কারণে ঐতিহাসিক। প্রথমত, এটি দেশের প্রথম ডিজিটাল জনগণনা। দ্বিতীয়ত, প্রথমবার সাধারণ মানুষ ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের তথ্য নথিভুক্ত করতে পারবেন। তাঁর দাবি, এর ফলে জনগণনা আরও নাগরিক-কেন্দ্রিক ও অংশগ্রহণমূলক হবে।
তিনি জানান, আগে জনগণনায় কাগজ-কলম নির্ভর তথ্য সংগ্রহের দীর্ঘ প্রক্রিয়া থাকলেও এবার মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একই সঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে একাধিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে জনগণনার প্রথম পর্যায় শুরু হবে আগামী ১ আগস্ট। ১ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত চলবে স্ব-গণনা বা ‘সেলফ-এনুমেরেশন’। এরপর ১৬ আগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ‘হাউস লিস্টিং অপারেশন’। দ্বিতীয় পর্যায়ে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে হবে জনসংখ্যা গণনার কাজ। ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতের মধ্যেই গোটা জনগণনা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল জনগণনার জন্য একাধিক অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের কথাও জানান তিনি। এইচএলও মোবাইল ম্যাপ অ্যাপ, সেন্সাস সিএমএমএস পোর্টাল এবং ওয়েব ম্যাপিং অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাজ হবে।
ডঃ কমল আরও জানান, ১ আগস্ট মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর স্ব-গণনার মাধ্যমে রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সেলফ-এনুমেরেশন’ কর্মসূচির সূচনা করা হবে। রাজ্যপাল, প্রধান বিচারপতি-সহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও এই কর্মসূচিতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে স্ব-গণনায় উৎসাহিত করা হবে।
তিনি সকল নাগরিককে জনগণনায় অংশগ্রহণ এবং পরিবারের স্ব-গণনা সম্পন্ন করার আহ্বান জানান। তাঁর কথায়, উন্নয়ন, পরিকল্পনা এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনগণনার তথ্য ভবিষ্যতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।