কলকাতার সামগ্রিক উন্নয়ন ছাড়া সমগ্র বাংলার বিকাশ সম্ভব নয়—এই স্পষ্ট বার্তা দিয়েই সোমবার কলকাতা পুরসভায় প্রথমবারের মতো পা রাখলেন নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের প্রস্তুতি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে তিনি কলকাতাকে ঘিরে একাধিক উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। পাশাপাশি, পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে মহানগরীকে দীর্ঘদিন অবহেলা করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, কলকাতা পুরসভা উপযুক্ত প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিলে রাজ্য সরকার অতিরিক্ত উন্নয়ন খাতে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করতে প্রস্তুত। তাঁর কথায়, চলতি অর্থবর্ষে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এই অর্থ দেওয়া সম্ভব, যদি পুরসভার পক্ষ থেকে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়।
শুধু তাই নয়, কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘অমৃত যোজনা’-য় আরও ৫০০ কোটি টাকা এবং ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পে আরও ৫০০ কোটি টাকার কাজের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। গঙ্গা দূষণ রোধে নতুন এসটিপি (সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) নির্মাণ ও পরিকাঠামো সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি। এছাড়াও ‘স্বচ্ছ ভারত’ এবং ‘আরবান চ্যালেঞ্জ ফান্ড’-এর মতো প্রকল্পগুলির মাধ্যমে কলকাতার উন্নয়নে আরও অর্থায়নের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমি চাই কলকাতাকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হোক। ‘আমি’ নয়, ‘আমরা’—এই নীতিতে বিশ্বাস রেখেই কলকাতাকে দেশের অন্যতম সেরা শহরে পরিণত করতে হবে।”
পরে সাংবাদিক বৈঠকে গঙ্গা দূষণ ইস্যুতে পূর্বতন সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, এত প্রাকৃতিক সম্পদ এবং পর্যাপ্ত জলপ্রবাহ থাকা সত্ত্বেও গঙ্গাকে পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, অতীতে এসটিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি বদলাতে তিনি নিজেই আগামী বুধবার সকালে গঙ্গার পাড় পরিষ্কার অভিযানে অংশ নেওয়ার ঘোষণা করেন।
কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক কাজের ধীরগতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, অর্থবর্ষের শুরুতে এখনও পর্যন্ত পুরসভার পক্ষ থেকে কোনও উল্লেখযোগ্য ডিপিআর (ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট) জমা দেওয়া হয়নি। নির্বাচনী বিধিনিষেধকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও তিনি স্পষ্ট করে দেন, প্রশাসনিক ও প্রকৌশল সংক্রান্ত কাজের ক্ষেত্রে এমন কোনও বাধা ছিল না।
শুভেন্দু অধিকারীর মতে, কলকাতা পুরসভার শক্তিশালী ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জল সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রাথমিক শিক্ষা পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেবল সদিচ্ছার অভাবেই উন্নয়ন থমকে ছিল। তাঁর কথায়, “সব আছে, শুধু ইচ্ছার অভাব ছিল।”
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি চাইলে নবান্নে ডেকে বৈঠক করতে পারতেন, কিন্তু কলকাতা পুরসভায় এসে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে চেয়েছেন—কলকাতার সামগ্রিক উন্নয়ন ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায় ও উত্তম কুমারের মতো মনীষীদের স্মৃতিবিজড়িত এই শহরের ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। ভবানীপুরের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে উল্লেখ করে কলকাতার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেন মুখ্যমন্ত্রী।