সই জাল কাণ্ডের শিকড় খুঁজতে বিধানসভায় সিআইডি, স্পিকারের সচিবালয়েও এই নিয়ে খোঁজখবর
সোমবার ভরদুপুরে আচমকাই সরগরম হয়ে উঠল রাজ্য রাজনীতির ভরকেন্দ্র। দুপুর পৌনে দুটো নাগাদ সোজা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় হাজির হলেন সিআইডি আধিকারিকরা। উদ্দেশ্য, রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদলের অন্দরে ঘটে যাওয়া বহু চর্চিত সই জাল কাণ্ডের তদন্ত। স্পিকারের সচিবালয় থেকে বিধানসভার রেজোলিউশন বা প্রস্তাবের কপি সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য সংগ্রহ করতেই তদন্তকারী দলের এই আকস্মিক হানা বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। খোদ বিধানসভা চত্বরে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এই উপস্থিতি ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
কিন্তু ঠিক কী কারণে হঠাৎ বিধানসভায় হানা দিল সিআইডি? গোয়েন্দা সূত্রে খবর, তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন বিধায়কের সই জাল করার যে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে, সেই মামলার তদন্ত ইতিমধ্যেই অনেক দূর এগিয়েছে। এই ঘটনার একেবারে শিকড়ে পৌঁছতেই সোমবারের এই বিশেষ অভিযান। ইতিপূর্বে এই হাইপ্রোফাইল সই জালিয়াতি মামলায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দু’দফায় ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। শুধু তাই নয়, গত রবিবার তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষকেও ডেকে পাঠানো হয়েছিল। জানা গিয়েছে, ভবানী ভবনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কুণাল ঘোষকে মুখোমুখি বসিয়ে প্রায় ১৪-১৫ ঘণ্টা ধরে টানা জেরা করেন গোয়েন্দারা। তদন্তকারীদের দাবি, এই সামনাসামনি জেরায় অভিষেকের বয়ানে একাধিক গুরুতর অসংগতি মিলেছে। সেই অসংগতিগুলি খতিয়ে দেখতে এবং প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতেই বিধানসভার রেকর্ড পরীক্ষা করা তদন্তকারীদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
তদন্তকারী দলের আধিকারিকরা সোমবার বিধানসভায় প্রবেশ করে সরাসরি স্পিকারের সচিবালয়ের দিকে অগ্রসর হন। তাঁদের হাতে বেশ কিছু ফাইল ও নথিপত্র ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। রেজোলিউশন কপিতে থাকা বিধায়কদের স্বাক্ষরগুলি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় জাল করা হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট আইনি হদিস পেতেই তাঁরা বিধানসভার আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এর আগে এই মামলায় শাসকদলের মোট ১৩ জন বিধায়ককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিধানসভায় যখন কোনও দলের বিধায়করা রেজোলিউশন বা প্রস্তাব আনেন, তখন সেখানে তাঁদের স্বাক্ষর থাকে। সেই আসল স্বাক্ষরগুলির সঙ্গে জাল বলে দাবি করা স্বাক্ষর মিলিয়ে দেখার আইনি প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবেই স্পিকারের সচিবালয় থেকে এই রেজোলিউশন কপিগুলি সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে, সই জাল কাণ্ডের তদন্তে খোদ বিধানসভার মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সিআইডির এই উপস্থিতিকে হাতিয়ার করে বিরোধী দলকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে শাসক শিবির। গোটা ঘটনাটিকে নজিরবিহীন বলে কড়া ভাষায় তোপ দেগেছেন বিজেপি নেতা দেবজিৎ সরকার। তিনি বলেন, "ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। নিজের দলের বিধায়কদের সই চুরি করেছে, সই জাল করেছে! ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে ওরা পুরো খোদাই করে দিয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস মানেই চোর।"
অন্যদিকে, বিধানসভার অন্দরে তদন্তকারী সংস্থার প্রবেশ নিয়ে যে আইনি প্রশ্ন বা ধন্দ তৈরি হচ্ছিল, তার কড়া জবাব দিয়েছেন বিজেপি নেতা তথা আইনজীবী তরুণজ্যোতি তিওয়ারি। আইনি প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, "কোথাও বিধানসভায় যাওয়া যাবে না বা এনকোয়ারি করা যাবে না, এই কনসেপ্টগুলো আসে কোথা থেকে! আইনের ঊর্ধ্বে তো কেউ নয়। যে কোনও জায়গায় তদন্তের খাতিরে তারা যেতে পারে। রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হচ্ছে।"
রাজনৈতিক এই তীব্র তরজার মাঝেই সিআইডির এই পদক্ষেপ তদন্তের গতিপ্রকৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করল। শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের নাম সরাসরি জড়িয়ে থাকায় এই মামলা প্রথম থেকেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তার উপর বিধানসভায় গিয়ে তথ্য তল্লাশি করার ঘটনা প্রমাণ করছে, তদন্তকারীরা তথ্যপ্রমাণের ক্ষেত্রে কোনো ফাঁকফোকর রাখতে চাইছেন না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়ানের ঠিক কোন জায়গায় অসংগতি মিলেছে এবং বিধানসভা থেকে প্রাপ্ত নথি সেই আইনি জট কাটাতে কতটা সাহায্য করবে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য। তদন্তের জাল গোটানোর এই চূড়ান্ত পর্যায়ে সিআইডি-র এই তৎপরতা বুঝিয়ে দিচ্ছে, খুব শীঘ্রই সই জাল কাণ্ডের নেপথ্যে থাকা মূল চক্রীদের পরিচয় প্রকাশ্যে আসতে চলেছে।