ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে দাঁড়িয়েও নিজের অবস্থান থেকে একচুল নড়তে নারাজ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনী প্রতিদিনই অগ্রসর হচ্ছে এবং কৌশলগত দিক থেকে রাশিয়া এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে একইসঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদি কিয়েভ আপসের পথে হাঁটে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি উদ্যোগকে গ্রহণ করে, তাহলে যুদ্ধের অবসানের পথও খুলে যেতে পারে।
রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় এসব মন্তব্য করেন পুতিন।
জেলেনস্কির খোলা চিঠি, বৈঠকের প্রস্তাব
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট Volodymyr Zelenskyy যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সরাসরি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। এক খোলা চিঠিতে তিনি পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাব দেন।
জেলেনস্কি স্পষ্ট করে জানান, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ থাকলেও ইউক্রেন আত্মসমর্পণের পথে হাঁটবে না। আলোচনায় অগ্রগতি না হলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দেশ প্রস্তুত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘প্রতিদিন এগিয়ে চলছে রুশ অভিযান’
পুতিন দাবি করেন, সামরিক, অর্থনৈতিক এবং শিল্প সক্ষমতার বিচারে রাশিয়া এখনও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রুশ বাহিনী প্রায় ২,৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় সেনাদের সরিয়ে দিয়েছে। এছাড়া রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পুতিনের দাবি অনুযায়ী—
লুহানস্ক অঞ্চলের প্রায় ১০০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।
দোনেৎস্ক অঞ্চলের ৮৫ শতাংশের বেশি এলাকা মস্কোর দখলে।
জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের প্রায় ৮০ শতাংশ অংশ রুশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তবে এই দাবিগুলিকে ইউক্রেন এবং পশ্চিমা দেশগুলি মানতে নারাজ। তাঁদের মতে, রাশিয়ার অগ্রগতি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গিয়েছে এবং ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি।
ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনার উল্লেখ
আলোচনায় পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর নামও উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনায় উঠে আসা কয়েকটি সমঝোতার প্রস্তাব রাশিয়া গ্রহণ করতে প্রস্তুত বলেও জানান পুতিন।
রুশ প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, “আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু আলোচনার জন্য ইউক্রেনকেও বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিতে হবে এবং কিছু আপস করতে হবে।”
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে বার্তা
আলোচনার সময় রাশিয়ার সামরিক শক্তি নিয়েও কথা বলেন পুতিন। তিনি জানান, রাশিয়ার ‘ওরেশনিক’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এখনও বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়নি।
পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বলে দাবি করেন তিনি। পুতিনের মতে, আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষেও এই ক্ষেপণাস্ত্র আটকানো অত্যন্ত কঠিন।
তবে পশ্চিমা সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
২০৩৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা?
আলোচনায় নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও মুখ খোলেন Vladimir Putin।
১৯৯৯ সাল থেকে রাশিয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা পুতিন জানান, সাংবিধানিকভাবে তাঁর সামনে আরও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচিত হলে তিনি ২০৩৬ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
তবে আপাতত সে বিষয়ে ভাবছেন না বলেই জানিয়েছেন তিনি।
পুতিনের কথায়, “রাশিয়ার সামনে এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের ভবিষ্যৎ এবং বর্তমান সংকট মোকাবিলাই আমার প্রধান অগ্রাধিকার।”
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী স্থলযুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত। লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি, কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে এই যুদ্ধ।
এমন পরিস্থিতিতে পুতিনের কঠোর অবস্থান এবং একইসঙ্গে আলোচনার প্রতি সীমিত আগ্রহ আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। এখন দেখার, জেলেনস্কির বৈঠক প্রস্তাব এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ আগামী দিনে যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করতে পারে কিনা।