রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই একের পর এক নতুন উদ্যোগ এবং প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে হাঁটছে বর্তমান সরকার। প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই বার্তা দেওয়া হয়েছিল, রাজ্যের মানুষ এবার থেকে কেন্দ্রের সমস্ত জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। সেই প্রতিশ্রুতি রেখেই এবার রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড়সড় পদক্ষেপ করল স্কুল শিক্ষা দফতর। সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলির সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজ্যে কার্যকর করা হল কেন্দ্রীয় সরকারের মেগা স্কিম— ‘বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প’ (Vidyanjali Scheme)।
সম্প্রতি স্কুল শিক্ষা দফতরের তরফ থেকে রাজ্যের সমস্ত জেলায় এই প্রকল্প দ্রুত কার্যকর করার জন্য একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। কিন্তু কী এই বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প? কেনই বা সরকার এই উদ্যোগ গ্রহণ করছে? আসুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প কী?
‘বিদ্যাঞ্জলি’ (Vidyanjali) মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের (Ministry of Education) অধীনস্থ একটি স্কুল স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচি বা ভলান্টিয়ার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (NEP 2020)-এর রূপরেখা মেনে ২০২১ সালে সারা দেশে এই পোর্টালটির সূচনা করা হয়।
এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল— সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, স্বনিযুক্ত পেশাদার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (NGO) বা কর্পোরেট সেক্টরকে (CSR) সরাসরি সরকারি স্কুলের সঙ্গে যুক্ত করা। এর মাধ্যমে আগ্রহী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানরা স্বেচ্ছায় স্কুলের পঠনপাঠন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নে সরাসরি অংশ নিতে পারবেন।
কেন এই প্রকল্প? (প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য)
সরকারি স্কুলগুলিতে অনেক ক্ষেত্রেই পরিকাঠামো বা বিশেষ প্রশিক্ষণের অভাব দেখা যায়। সরকারের একার পক্ষে সব সময় সমস্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। এই ঘাটতি পূরণ করতেই সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইছে সরকার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মূলত দুটি ক্ষেত্রে সাহায্য করা যাবে:
পরিষেবা বা জ্ঞান প্রদান (Services/Activities): স্বেচ্ছাসেবকরা স্কুলে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো, কেরিয়ার গাইডেন্স দেওয়া, স্পোকেন ইংলিশ শেখানো, যোগব্যায়াম, খেলাধুলা, শিল্পকলা, কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও কোডিংয়ের মতো আধুনিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন।
পরিকাঠামোগত সাহায্য (Assets/Materials): কোনও ব্যক্তি বা সংস্থা চাইলে স্কুলকে বেঞ্চ, ফ্যান, পানীয় জলের ব্যবস্থা, কম্পিউটার, ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম, প্রজেক্টর, বা খেলাধুলার সামগ্রী দান করতে পারবেন। এমনকি স্কুল ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামতির কাজেও আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারবেন।
কীভাবে কাজ করবে এই ব্যবস্থা?
গোটা প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যাতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় থাকে:
১. রেজিস্ট্রেশন: প্রথমেই রাজ্যের প্রতিটি স্কুলকে তাদের UDISE+ কোড ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘বিদ্যাঞ্জলি পোর্টাল’-এ নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে হবে।
২. চাহিদা জ্ঞাপন: স্কুলের কী ধরনের সাহায্য বা পরিকাঠামো প্রয়োজন, তা পোর্টালে জানাতে হবে।
৩. স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ: পোর্টালের মাধ্যমে আবেদনকারী স্বেচ্ছাসেবক বা সংস্থাগুলির যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করবে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এরপর নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁদের শর্টলিস্ট করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।
শিক্ষামহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া: আশা বনাম আশঙ্কা
সরকার পরিবর্তনের পর শিক্ষা দফতরের এই দ্রুত সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন আশার আলো দেখছেন অনেকেই, তেমনই শিক্ষামহলের একাংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিতর্কও।
আশার দিক: ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই প্রকল্পের ফলে স্কুলগুলি কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (CSR) ফান্ডের সুবিধা পাবে। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের ফেলে আসা স্কুলের প্রতি দায়বদ্ধতা পালনের সুযোগ পাবেন। এতে আখেরে লাভবান হবে গ্রামীণ ও মফস্বলের পড়ুয়ারাই।
আশঙ্কার দিক: অন্যদিকে, শিক্ষকদের একাংশ এই পদক্ষেপে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। তাঁদের অভিযোগ, এই প্রকল্পের আড়ালে সরকার ধীরে ধীরে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো উন্নয়নের দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। স্কুল পরিচালনার ক্ষেত্রে আগামী দিনে বেসরকারি সংস্থাগুলির হস্তক্ষেপ বাড়তে পারে, যা পরোক্ষভাবে শিক্ষা ব্যবস্থার বেসরকারিকরণের দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন একাধিক শিক্ষক সংগঠন।
তবে স্কুল শিক্ষা দফতর সাফ জানিয়েছে, এটি কোনও পিপিপি (PPP) মডেল নয় এবং এতে বেসরকারিকরণের কোনও জায়গাই নেই। বরং সমাজের যৌথ প্রয়াসে সরকারি স্কুলগুলিকে আরও শক্তিশালী করে তোলাই এই বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য।