হাওড়ার বাগনানের খাটুল গ্রামে কাটমানির প্রতিবাদ ঘিরে এক বিজেপি সমর্থকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে রাজ্য সরকার এবার মামলার তদন্তভার সিআইডি-র হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুক্রবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘোষণা করেন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মফিজুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি প্রকল্পের অর্থ বণ্টনে অনিয়ম ও কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ উঠছিল। অভিযোগ, আবাস যোজনাসহ একাধিক সরকারি প্রকল্পে প্রকৃত উপভোক্তাদের বঞ্চিত করে আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে।
এই অভিযোগের প্রতিবাদে এলাকার কিছু বাসিন্দা সম্প্রতি উপপ্রধানের বাড়িতে গিয়ে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিযোগ, সেই সময় উপপ্রধানের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি প্রতিবাদীদের উপর হামলা চালায়। ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি গুরুতর জখম হন এবং প্রশান্ত দে নামে এক বিজেপি সমর্থকের মৃত্যু হয়।
নবান্নে সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করতেই পারেন, কিন্তু বিচার ও আইনি পদক্ষেপের দায়িত্ব প্রশাসনের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। তিনি সাধারণ মানুষকে পুলিশের উপর আস্থা রাখার আবেদন জানান।
ইতিমধ্যেই নিহতের স্ত্রী সোমা দের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মূল অভিযুক্ত-সহ মোট আটজনকে গ্রেফতার করেছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে খুন-সহ একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য সরকার নিয়েছে। তাঁরা বর্তমানে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রাজ্যের মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খান হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিয়েছেন।
নিহত প্রশান্ত দের পরিবারের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চার লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অতিরিক্ত পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে নিহতের পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার পাশে থাকবে এবং চাকরির বিষয়েও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী দুর্নীতি ও অপরাধের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, অপরাধীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষ বাহিনীর সহায়তায় তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। সম্প্রতি ভিনরাজ্য থেকে এক অভিযুক্তকে গ্রেফতারের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি।
বাগনান কাণ্ডের পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা এলাকায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই ঘটনায় একাধিক কঠোর ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই বহু অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি।
সব মিলিয়ে বাগনানের এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। তবে তদন্তভার সিআইডি-র হাতে তুলে দিয়ে রাজ্য সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, এই ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।