পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারের আমলে শুরু হওয়া বহু চর্চিত তাজপুর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প নিয়ে এবার বড়সড় ঘোষণা করল বর্তমান প্রশাসন। নবান্নে উচ্চ পর্যায়ের এক প্রশাসনিক বৈঠকের পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দিলেন, পরিকাঠামোগত কারণে তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে রাজ্যের শিল্পায়নের স্বার্থে এবং কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখে তাজপুরের বদলে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে দাদনপত্রবাড়ে এই বন্দর তৈরি করার পথে এগোচ্ছে বর্তমান সরকার।
জানা গিয়েছে, রাজ্যের জলপথ এবং শিপিং ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। নবান্ন সূত্রে খবর, এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর। পাশাপাশি রাজ্যের মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান, পরিবহন ও শিল্প দফতরের আধিকারিক এবং কলকাতা কর্পোরেশনের উচ্চপদস্থ কর্তারাও এই পর্যালোচনা বৈঠকে অংশ নেন। মূলত রাজ্যের বন্দর পরিকাঠামোর উন্নয়ন, বিনিয়োগ টানা এবং বাণিজ্যের প্রসারের রূপরেখা নিয়েই দীর্ঘ আলোচনা হয় এ দিনের প্রশাসনিক বৈঠকে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাজপুর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু করেছিল বর্তমান রাজ্য সরকার। সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানান, তাজপুর পোর্ট নিয়ে সরকারের তরফে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের বিষয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর করণ আদানির সঙ্গেও ইতিমধ্যে আলোচনা সেরেছে রাজ্য সরকার। এমনকি আদানি গ্রুপের প্রতিনিধিরা ওই প্রস্তাবিত এলাকা পরিদর্শন করেও গিয়েছেন। সব দিক খতিয়ে দেখার পরেই রাজ্য এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে।
কিন্তু ঠিক কী কারণে বাতিল হল তাজপুর বন্দর? এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "আমি বিরোধী দলনেতা থাকার সময়ও বারবার এই পরিকাঠামোগত সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলাম। একটি গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করতে গেলে অন্তত কয়েক হাজার একর নিষ্কণ্টক জমি, উন্নত রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত ওয়ারহাউস বা গুদামের প্রয়োজন হয়।" বর্তমান সরকারের সার্বিক মূল্যায়নেও এই বিষয়টি জলের মতো স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং বিপুল পরিমাণ জমির অভাবেই তাজপুরে এই বিশাল মাপের বন্দর গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব। উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলেই এই তাজপুর বন্দর প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে পারল না।
তাজপুরে বন্দর হচ্ছে না ঠিকই, তবে রাজ্যের মানুষের আশাহত হওয়ার কোনও কারণ নেই বলে এদিন আশ্বস্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। কারণ, তাজপুর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে দাদনপত্রবাড় এলাকায় এই গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য বিকল্প চিন্তাভাবনা শুরু করেছে রাজ্য প্রশাসন। সরকারের মতে, এই বিকল্প স্থানটি বন্দর নির্মাণের জন্য অনেক বেশি উপযুক্ত, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং বাস্তবসম্মত। রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্যে এই নতুন প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
প্রশাসনিক সূত্রে খবর, দাদনপত্রবাড়ে আগে একটি নুনের কারখানা ছিল। বর্তমানে সেখানে রাজ্য সরকারের প্রায় ১৭০০ একর জমি সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সরকারি জমিকে কাজে লাগিয়েই এবার বন্দর তৈরির পথে জোরকদমে এগোতে চাইছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, জমি অধিগ্রহণের মতো জটিল সমস্যা না থাকায় এবং এক লপ্তে পর্যাপ্ত জায়গা মেলায় এই প্রকল্প অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবেই রূপায়ণ করা সম্ভব হবে। আগামী দিনে এই বিকল্প জায়গাতেই বন্দর তৈরির ব্লু-প্রিন্ট বা রূপরেখা চূড়ান্ত করতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যৌথভাবে কাজ করবে বলে জানা গিয়েছে।