আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী। কিন্তু তার আগেই তো কলকাতার বেশকিছু নামিদামি পুজোর দশমী হয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, পুজো হবে তো? হাতেগোনা চার মাস বাকি রয়েছে দুর্গাপুজোর। ছোট বড় মাঝারি কলকাতা সমস্ত পুজো কমিটিগুলো এখন থেকেই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন। দুর্গাপুজো বলে কথা। কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণের যে সমস্ত পুজোগুলোতে ভিড়ের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার জন্য বড়সড়ো ভূমিকা গ্রহণ করে তার মধ্যে অন্যতম চেতনা অগ্রণী, সুরুচি, টালা প্রত্যয়, শ্রীভূমি। আরো আছে। যে সমস্ত পুজোগুলোর পিছনে এক একজন করে 'বড় নেতা-মন্ত্রীর' হাত থাকে বা ছিল। পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পূজা উদ্বোধন করতেন। আবার কোন পুজোর থিম সং লিখতেন। কোন পুজোয় গিয়ে সনাতন ধর্মের নিয়মিত তোয়াক্কা না করেই সময়ের আগেই চোখ এঁকে ফেলতেন। এই সমস্ত পুজো গুলোর কি হবে? "সাধারণ মানুষের চাঁদার পয়সা দিয়ে আমরা পূজো করব" বলে বাংলার কলরবকে জানিয়েছেন সুরুচি সংঘের এক সদস্য। দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম সেরা পুজো সুরুচি সংঘ। লাইন দিয়ে ঢুকতে হবে। এদিক ওদিক করা যাবে না। রীতিমতো ব্যস্ত থাকবে। এমনকি সংবাদ মাধ্যম কেও প্রবেশ করতে হলে পুজো কমিটির ছোটখাটো কেষ্ট বিষ্টুদের সরকারি প্রেস কার্ড দেখাতে হবে। অরূপ বিশ্বাসের পুজো বলে কথা। রাজ্যের এক সময় দোর্দন্ড প্রতাপ নেতা এবং মন্ত্রী। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পুজো উদ্বোধন করতেন। আবার থিম সং লিখতেন। অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাস টলি পাড়ায় তার প্রতাপ দেখাতেন। অরূপ বিশ্বাস করতেন দুর্গাপুজো আর টলি পাড়ার শিল্পী থেকে কর্মীরা মুখ বুজে অপমানিত হয়ে স্বরূপ পুজো করতেন। কিন্তু আর করা যাবে না। ইতিমধ্যেই শ্রীঘরে স্বরূপ বিশ্বাস। আর অরূপ বিশ্বাস এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত। তার উপরে এলআইসি'র জমি দখল করে পুজোর অভিযোগ।এখন প্রশ্ন অবশ্যই উঠেছে, অরূপের পূজো সুরুচির কি হবে? এবার দক্ষিণ কলকাতা আরো এক দামী পুজো চেতলা অগ্রণী। মন্ত্রী তথা কলকাতা পুরসভার মেয়রের পুজো। প্রচুর ভিড়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের পুজোতে মায়ের চোখ আঁকতেন। তৎকালীন সময় মুখ্যমন্ত্রীর এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন অনেক হিন্দু ধর্মের মানুষরা। একটা নিয়ম তো রয়েছে। সেই নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মায়ের চোখ এঁকে পুজো উদ্বোধন করছেন। ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষ থেকেও একাধিকবার প্রতিবাদ করা হয়েছে। কিন্তু তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কর্ণপাত করেননি। সেই পুজোর এবার কি হবে? ফিরহাদ হাকিম বিধানসভা নির্বাচনে জিতেছেন। কিন্তু কলকাতা পুরসভার মেয়র এর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তৃণমূলের মধ্যেই ভাঙ্গন। এমন অবস্থায় চেতনা অগ্রণীর পুজোর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এক সময় রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নাকতলা উদয়ন সংঘ দুর্গা পুজোতে হইচই ফেলে দিয়েছিল। এরপর দুর্নীতির জন্য জেলে যেতে হয় পার্থ বাবুকে। ছাড়া পেয়েছেন বটে কিন্তু নাকতলা উদয়ন সংঘের নাক কাটা গেছে আগেই। রাজডাঙ্গা নবোদয়। পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে রমরমা হয় এই পুজোর। ১০৮ নম্বর ওয়ার্ড, কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ। গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে পালিয়ে গেছেন তিনি। তাহলে এই পূজোর কি হবে? প্রশ্ন আছে এখনই উত্তর নেই।
বুর্জ খালিফা করে তাক লাগিয়েছিল, মাকে সোনার গয়নায় মুড়ে প্রতিপত্তি দেখিয়েছিল দোর্দন্ডপ্রতাপ পুজো উদ্যোক্তা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু। পুজোর নাম শ্রীভূমি। এখন তো তিনি শ্রী ঘরে। তাহলে পুজোর ভবিষ্যৎ? এখানেও প্রশ্ন আছে কিন্তু উত্তর নেই। "পুজো তো করতে হবে। সামনেই মিটিং আছে। দেখা যাক কি হয়" আফসোস করে মিনমিন করে বললেন শ্রীভূমির এক সদস্য। টালা প্রত্যয়। তৃণমূল আমলেই রমরমা। আর এবার কি হবে? তবে এ ব্যাপারে এগডালিয়া এভারগ্রীন নিজেদের মতো করেই পুজো করতে শুরু করে দিয়েছে। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের পুজো ছিল। একসময়কার পঞ্চায়েত মন্ত্রী। গত হয়েছেন, কিন্তু তারপরেও এই পুজোর ঐতিহ্য নষ্ট হয়নি। এ তো গেল তৃণমূল আমলের রমরমা পূজোর ব্যাপার। কিন্তু যে সমস্ত পুজোগুলোর দিকে এবার আরো বেশি করে ফোকাস হবে, তার মধ্যে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার। "তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোহাম্মদ আলী পার্কের পুজো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অযৌক্তিকভাবে" জানালেন কলকাতা পুরসভার দীর্ঘদিনের জনপ্রতিনিধি মিনা দেবী পুরোহিত। এবার সেখানে পুজো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পুজোগুলোর উদ্বোধন কিভাবে হবে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তিনি করবেন কিনা এ ব্যাপারে এখনো কিছু স্পষ্ট হয়নি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্বোধনে যাবেন কিনা সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ কে যে তার সঙ্গে রয়েছে তিনি নিজেই জানেন না। তবে এবার দুর্গাপুজো নিয়ে একটা বড়সড় ভূমিকা থাকবে, ভারতীয় জনতা পার্টির এবং রাজ্য সরকারের। সেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ থেকে শুরু করে অনেকেই কলকাতায় আসবেন বলে জানা গেছে।
কলকাতা
বিসর্জনের আগেই 'দশা' খারাপ তৃণমূল যুগের জৌলুসপূর্ণ শহরের নামিদামি পূজাগুলোর
নেতাও নেই-ক্ষমতাও নেই , রয়েছে অনিশ্চয়তার মেঘ ,পুজো কমিটিগুলো এখন থেকেই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন।