বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশের পরই সরকারের আর্থিক নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে তীব্র আক্রমণ করল বিরোধী শিবির। বাজেট পেশের পর বিধানসভার প্রেস কর্নারে সাংবাদিক সম্মেলন করে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, এই বাজেটে উন্নয়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই এবং সংখ্যালঘু উন্নয়নের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন বরাদ্দ ছাঁটাই করা হয়েছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এত অল্প সময়ে গোটা বাজেটের বিশদ বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে যে পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য কোনও নির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা প্রকল্পভিত্তিক আর্থিক পরিকল্পনা বাজেটে উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর মতে, “পরিকাঠামো নির্মাণ না হলে মানুষের হাতে টাকা পৌঁছবে না, আর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে অর্থনীতি কখনও শক্তিশালী হতে পারে না।”
রাজ্যের শিল্পনীতি এবং ‘ইজ অফ ডুইং বিজনেস’ প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধী দলনেতা। তিনি বলেন, বিরোধীরা শিল্পায়নের বিরোধী নয়, কিন্তু সহজে ব্যবসার নামে যদি একের পর এক সরকারি পরিষেবা বা সম্পদ বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারিকরণ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পরিবর্তে কর্পোরেট সংস্থাগুলির মুনাফা বৃদ্ধির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাজেটের সবচেয়ে বড় সমালোচনা উঠে আসে সংখ্যালঘু ও মাদ্রাসা দপ্তরের বরাদ্দ কমানোকে কেন্দ্র করে। বিরোধী দলের দাবি, পূর্ববর্তী বাজেটগুলিতে এই দপ্তরের জন্য পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও এবারের বাজেটে তা কমিয়ে প্রায় দুই হাজার কোটির কিছু বেশি করা হয়েছে। এই বিপুল বরাদ্দ হ্রাসকে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি ‘বিমাতৃসুলভ আচরণ’ বলে আখ্যা দেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি বলেন, “সবকা সাথ, সবকা বিকাশের কথা বলা হলেও বাজেটের বরাদ্দে তার প্রতিফলন নেই। সংখ্যালঘু উন্নয়নের খাতে বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত হতাশাজনক।”
তবে বাজেটের সমস্ত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেনি বিরোধী শিবির। রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য একলপ্তে ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দীর্ঘদিনের দাবির পর এই সিদ্ধান্ত কর্মচারীদের জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। একইসঙ্গে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে নতুন পাঁচটি জেলা গঠনের সিদ্ধান্তকেও সমর্থন জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, মালদহ, বালুরঘাট এবং কোচবিহার বিমানবন্দরের উন্নয়নের জন্য মাত্র ১০ কোটি টাকা বরাদ্দকে কার্যত ‘প্রতীকী ঘোষণা’ বলে কটাক্ষ করেছেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে এত কম অর্থে বিমানবন্দর পরিকাঠামোর কোনও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এদিন কলকাতা পুরসভার তরফে সুরাবর্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়েও প্রশ্নের মুখে পড়েন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও তিনি এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রাজ্যপালের ভাষণের উপর আলোচনার সময় বিধানসভার ভিতরে তিনি এ নিয়ে বিস্তারিত মতামত প্রকাশ করবেন।
রাজ্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট নিয়ে রাজনৈতিক তরজা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের বাজেট বিতর্কে এই সমালোচনা ও পাল্টা জবাব আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।