জ্যৈষ্ঠ মাস মানেই বাতাসে আম-কাঁঠাল আর লিচুর ম ম গন্ধ, আর বাঙালির ক্যালেন্ডারে লাল কালিতে দাগ দেওয়া একটি বিশেষ দিন— ‘জামাই ষষ্ঠী’। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথি এলেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় এক অন্যরকম ব্যস্ততা। শাশুড়ি-জামাইয়ের মধুর সম্পর্কের উদযাপনের এই দিনটি বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু সময়ের চাকা ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী উৎসবেও এসেছে বিস্তর বদল। কেমন ছিল সেকালের জামাই ষষ্ঠী আর কেমনই বা হলো একালের উদযাপন? ফিরে দেখা যাক ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমানের ব্যস্ত জীবনে।
কোথা থেকে এল এই ‘জামাই ষষ্ঠী’?
ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনি ঘাঁটলে এই উৎসবের এক চমকপ্রদ প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়। লোককথা অনুযায়ী, এক পরিবারে এক লোভী বউমা বাড়ির মাছ-দুধ চুরি করে খেয়ে দোষ চাপিয়ে দিতেন একটি কালো বিড়ালের ওপর। বিড়াল হলো মা ষষ্ঠীর বাহন। নিজের বাহনের এই অপমান সইতে না পেরে দেবী ষষ্ঠী রুষ্ট হন এবং সেই বউমার সন্তানরা একে একে হারিয়ে যায়।
পরে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ওই বধূ অরণ্যে গিয়ে মা ষষ্ঠীর কঠোর আরাধনা করেন এবং দেবী তুষ্ট হয়ে তাঁর সন্তানদের ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এই চুরির ঘটনা শ্বশুরবাড়ির লোকজন জেনে ফেলায় তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে বউমার বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেন। মেয়ের মুখ দেখতে না পেয়ে বাবা-মা ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। শেষমেশ জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে তাঁরা মা ষষ্ঠীর পুজো আয়োজন করেন এবং সেই ছলে মেয়ে ও জামাইকে নিমন্ত্রণ করে আনেন। সেই থেকেই এই দিনটি ‘জামাই ষষ্ঠী’ বা ‘অরণ্য ষষ্ঠী’ নামে বাংলার ঘরে ঘরে পালিত হয়ে আসছে।
সেকালের জামাই ষষ্ঠী: একান্নবর্তী পরিবারের মহামিলন
আগেকার দিনে জামাই ষষ্ঠী ছিল এক এলাহি ব্যাপার। একান্নবর্তী পরিবারে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা চলত মাসের পর মাস। সকাল থেকেই বাড়ি গমগম করত আত্মীয়স্বজনের ভিড়ে। শাশুড়ি মায়েরা স্নান সেরে, নতুন শাড়ি পরে উপোস করে পুজোয় বসতেন। পুজোর পর ধান-দূর্বা, হলুদ মাখানো সুতো (ষষ্ঠীর সুতো) দিয়ে জামাইয়ের মঙ্গলকামনা করা হতো। এরপর কাঁসার থালায় সাজিয়ে দেওয়া হতো আম, জাম, লিচু, কালো জাম আর নানা রকম মিষ্টি। সঙ্গে চলত শাশুড়ির হাতের তালপাতার পাখার মধুর বাতাস। দুপুরের মেনু ছিল দেখার মতো! বাড়ির রান্নাঘরে তখন উৎসবের মেজাজ। লুচি, ছোলার ডাল, বেগুন ভাজা, গঙ্গার রূপোলি ইলিশ, গলদা চিংড়ির মালাইকারি থেকে শুরু করে কচি পাঁঠার ঝোল— সবটাই শাশুড়ি মায়ের নিজের হাতে পরম যত্নে রাঁধা। জামাই বাবাজির পরনে থাকত কোঁচানো ধুতি আর গরদের পাঞ্জাবি। উপহার হিসেবে আদানপ্রদান হতো তাঁতের শাড়ি এবং ধুতি।
একালের জামাই ষষ্ঠী: রেস্তোরাঁ, বুফে আর স্মার্টওয়াচের যুগ
বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে তৈরি হয়েছে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা ছোট পরিবার। সময়ের অভাব আর কর্মব্যস্ততার কারণে জামাই ষষ্ঠীর রূপ আজ অনেকটাই বদলে গেছে।এখন আর শাশুড়ি মায়ের হাতে অত সময় বা শারীরিক সামর্থ্য নেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্নাঘরে কাটানোর। তাই বাড়ির ডাইনিং টেবিলের জায়গা দখল করেছে শহরের নামিদামি রেস্তোরাঁগুলোর ‘জামাই ষষ্ঠী স্পেশাল থালি’ বা ‘বুফে’। অ্যাপের মাধ্যমে বাড়িতে খাবার ডেলিভারি নেওয়াও এখন চূড়ান্ত জনপ্রিয়। তালপাতার পাখার জায়গা নিয়েছে এয়ার কন্ডিশনার। আর ধুতি-পাঞ্জাবি সামলানোর ঝক্কি এড়াতে এখনকার প্রজন্মের জামাইরা জিন্স, ক্যাজুয়াল শার্ট বা ডিজাইনার কুর্তাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। ধুতির বদলে এখন শ্বশুরমশাই বা জামাইয়ের হাতে উঠছে ব্র্যান্ডেড শার্ট, পারফিউম, স্মার্টওয়াচ বা লেটেস্ট গ্যাজেট। কর্মসূত্রে যে জামাইরা ভিন রাজ্যে বা বিদেশে থাকেন, তাঁদের জন্য ভরসা এখন হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কল। অনলাইনেই শাশুড়ি মায়ের কাছে পৌঁছে যায় জামাইয়ের পাঠানো শাড়ি বা উপহার, আর স্ক্রিনের ওপার থেকেই আসে আশীর্বাদ।
সেকালের ‘আবেগ ও আয়োজন’ আজ জায়গা ছেড়ে দিয়েছে একালের ‘সুবিধা ও প্র্যাক্টিকালিটি’-কে।
পরিশেষে
তালপাতার পাখা হয়তো আজ এসির হাওয়ায় বিলুপ্তপ্রায়, মাটির ভাঁড়ের মিষ্টি দই হয়তো জায়গা নিয়েছে ফিউশন ডেজার্টের। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও একটি জিনিস বদলায়নি— তা হলো সম্পর্ক আর আন্তরিকতা। শাশুড়ির চোখের কোণের সেই তৃপ্তির হাসি আর জামাইয়ের প্রতি মঙ্গলকামনা আজও জ্যৈষ্ঠের এই দিনটিতে প্রতিটি বাঙালি পরিবারে একইরকম অমলিন। রূপ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু বাংলার জামাই ষষ্ঠী আজও তার নিজস্ব ভালোবাসার সুতোয় বাঁধা।