বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয় এবং রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই একের পর এক সংকটের মুখে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অন্দরে বিদ্রোহ, জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে জনরোষ এবং প্রশাসনিক চাপ—সব মিলিয়ে কার্যত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদল। এই আবহেই রবিবার তৃণমূল ভবনে কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরদের নিয়ে ডাকা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ মুহূর্তে বাতিল করে দিল দলীয় নেতৃত্ব।
দলীয় সূত্রের দাবি, বৈঠক ঘিরে ব্যাপক বিক্ষোভ, এমনকি কাউন্সিলরদের লক্ষ্য করে ডিম বা পচা টমেটো নিক্ষেপের আশঙ্কার খবর নেতৃত্বের কাছে পৌঁছেছিল। এর পাশাপাশি বহু কাউন্সিলরও নিরাপত্তার অভাবের কথা জানিয়ে প্রকাশ্যে বৈঠকে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করেই বৈঠক বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে।
সম্প্রতি কলকাতা পুরসভার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন ফিরহাদ হাকিম। তাঁর পদত্যাগের পর পুরসভার প্রশাসনিক কাজকর্ম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর বর্তমান পুরবোর্ড কেন ভেঙে দেওয়া হবে না, সেই বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে তিন দিনের মধ্যে জবাব তলব করেছে। ফলে দ্রুত নতুন মেয়র নির্বাচন করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এখন তৃণমূলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই প্রেক্ষাপটে রবিবার তৃণমূল ভবনে সমস্ত কাউন্সিলরকে নিয়ে জরুরি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছিল, নতুন মেয়র নির্বাচনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এমনকি প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের নামও আলোচনায় উঠে আসে।
তবে বৈঠক শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই তা বাতিল করে দেওয়া হয়। সূত্রের খবর, বর্তমান শাসকদলের সমর্থক এবং বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের সম্ভাব্য বিক্ষোভ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল তৃণমূল নেতৃত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় জনরোষের মুখে পড়েছেন দলের একাধিক জনপ্রতিনিধি। ফলে তৃণমূল ভবনে বড় জমায়েত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক মহলের মতে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে এই সিদ্ধান্তের পিছনে। খুব শীঘ্রই দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেই সফরের আগে দলের সদর দফতরের সামনে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তা জাতীয় স্তরে দলের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারত। সেই ঝুঁকি এড়াতেই শেষ মুহূর্তে বৈঠক বাতিল করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বৈঠক বাতিল হলেও নতুন মেয়র নির্বাচনের প্রক্রিয়া থেমে নেই। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এবার প্রকাশ্যে নয়, বরং সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে কাউন্সিলরদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে ডেকে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শহরের কোনও নিরাপদ ও নির্দিষ্ট স্থানে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা হারানোর ধাক্কা, কলকাতা পুরসভার অনিশ্চয়তা, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং জনরোষ—সব মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে সংগঠন ও পুরবোর্ড রক্ষার লড়াইয়ে আপাতত গোপন কৌশলের পথেই হাঁটছে দল।