গত ৩০ মে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে তাঁর ওপর হওয়া হামলার পর তিনি নাকি নিজের জন্য কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা চেয়েছেন। গত কয়েক দিন ধরেই সংবাদমাধ্যমের একাংশে কান পাতলে এমনটাই শোনা যাচ্ছিল। এবার সেই জল্পনায় কার্যত জল ঢেলে দিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কড়া বার্তার মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সংবাদমাধ্যমের এই দাবি সম্পূর্ণ 'ভিত্তিহীন' এবং 'সত্য থেকে বহু দূরে'। উল্টে নিজের নিরাপত্তার চেয়েও পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতা। তাঁর নিশানায় উঠে এসেছে কেন্দ্র ও রাজ্যের বর্তমান শাসকদল।
সোনারপুরের ওই অনভিপ্রেত ঘটনার পর ইতিমধ্যে সাত দিন পেরিয়ে গিয়েছে। এই আবহে তাঁর কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা চাওয়ার যে খবর চাউর হয়েছে, তা সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে দিয়েছেন অভিষেক। সোশ্যাল মিডিয়ায় করা ওই পোস্টে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন, হামলার পর থেকে এখনও পর্যন্ত তিনি নিজের সুরক্ষার জন্য কোনও মহলের কাছেই কোনও ধরনের বিশেষ নিরাপত্তার আবেদন জানাননি। তাঁর কথায়, এই ধরনের বিভ্রান্তিকর খবর ছড়ানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছাড়া আর কিছুই নয়। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিরোধী নেতার এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চাইলেন যে, রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে তিনি নিজের সুরক্ষার জন্য শাসকদলের মুখাপেক্ষী হতে রাজি নন।
শুধুমাত্র জল্পনা ওড়ানোই নয়, সোনারপুরের হামলার দায়ভার সরাসরি প্রশাসন ও নজরদারির চরম গাফিলতির ওপর চাপিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। অভিষেক তাঁর পোস্টে জোরালো যুক্তি দিয়েছেন যে, কেন্দ্র এবং রাজ্য— দুই সরকারের নিজস্ব গোয়েন্দা ও নজরদারির ঘেরাটোপের মধ্যেই এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটেছে। রাজ্যে এখন 'ডাবল ইঞ্জিন' সরকার চলছে, অর্থাৎ কেন্দ্র এবং রাজ্য— উভয় স্তরেই একই শিবিরের শাসন কায়েম রয়েছে। তা সত্ত্বেও একজন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতার ওপর কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে এমন হামলা হওয়া সম্ভব হলো, তা নিয়ে জোড়া-ইঞ্জিন সরকারকেই কড়া ভাষায় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন তিনি। তাঁর স্পষ্ট দাবি, এই চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার উভয়কেই সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
তবে নিজের ওপর হওয়া ওই হামলার চেয়েও অভিষেকের পোস্টে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আমজনতার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার প্রসঙ্গ। অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে তিনি লিখেছেন, রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি রীতিমতো আশঙ্কাজনক ও ভীতিপ্রদ। গত এক মাস ধরে গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর অজস্র অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে নারী নির্যাতনের পাশাপাশি ধর্ষণের মতো একাধিক নৃশংস এবং পাশবিক ঘটনাও রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। অভিষেকের আক্ষেপ, এই ভয়ংকর ঘটনাগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই সংবাদমাধ্যমের প্রচারের আলোয় সেভাবে উঠে আসেনি বা এদের প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের উদ্দেশে তাঁর কড়া বার্তা, যাঁরা এই মুহূর্তে শাসন ক্ষমতায় আসীন রয়েছেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাই তাঁদের প্রধান ও সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
ভুয়ো খবর এবং অপপ্রচার রুখতেও এদিন কড়া অবস্থান নিয়েছেন তৃণমূল নেতা। সংবাদমাধ্যমের একাংশের প্রতি তাঁর আবেদন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ এবং ভিত্তিহীন খবর ছড়ানো থেকে তারা যেন বিরত থাকে। পাশাপাশি, রাজ্য ও কেন্দ্রের বিভিন্ন নিরাপত্তা এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলির উদ্দেশেও কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। তৃণমূল নেতার মতে, রাজনৈতিক নেতাদের ঘিরে এই ধরনের অপপ্রচারকে প্রশ্রয় না দিয়ে, সংস্থাগুলির উচিত পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা প্রদানে নিজেদের সমস্ত মনোযোগ ও শক্তি নিয়োজিত করা।
সব শেষে অভিষেক মনে করিয়ে দিয়েছেন, এ রাজ্যের প্রত্যেকটি মানুষের নিরাপত্তা, প্রশাসনের দায়বদ্ধতা এবং প্রকৃত সত্য জানার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সোনারপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই রাজ্যের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা এবং নারী সুরক্ষার মতো জ্বলন্ত বিষয়গুলিকে হাতিয়ার করে পাল্টা প্রশাসনকেই চরম অস্বস্তিতে ফেলার কৌশল নিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।