পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক। আট লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত যে বাজেট পেশ করেছেন, তাকে তিনি ‘পঞ্চশক্তি’ নির্ভর উন্নয়নের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরেছেন। সেবা, নির্মাণ, জ্ঞান, জীবন ও শিল্প—এই পাঁচ স্তম্ভকে ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, যা অনেকের মতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপ পুনর্গঠনের ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর ধাঁচে তৈরি।
তবে বিরোধীদের দাবি, এই বাজেটের বড় অংশই কেন্দ্রীয় প্রকল্প ও আর্থিক সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। অর্থমন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় প্রকল্পকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মীদের স্বস্তি, ডিএ বৃদ্ধি ২০ শতাংশ
বাজেটের সবচেয়ে বড় ঘোষণাগুলির মধ্যে রয়েছে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য এক ধাক্কায় ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বৃদ্ধি। দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিযোগ ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি আশা কর্মী, সিভিক ভলান্টিয়ার, হোমগার্ড, গ্রিন পুলিশ ও অন্যান্য চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধিরও ঘোষণা করা হয়েছে।
চলতি অর্থবর্ষে ৫০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী, ২০ হাজার পুলিশকর্মী-সহ মোট ১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার।
পরিকাঠামোয় জোর, কেন্দ্রীয় সহায়তায় উন্নয়নের পরিকল্পনা
‘নির্মাণ শক্তি’ কর্মসূচির আওতায় রাজ্যের সড়ক, সেতু, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন জেলা, পুরসভা, হাসপাতাল ও ক্রীড়া পরিকাঠামো গঠনের রূপরেখাও রয়েছে এই বাজেটে।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ
‘জ্ঞান শক্তি’ কর্মসূচির আওতায় রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক হাজার স্কুলে রোবোটিক্স ও কোডিং শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা, নতুন মহিলা কলেজ, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং বেকার যুবকদের জন্য ‘ভরসা’ প্রকল্প ঘোষিত হয়েছে।
পাশাপাশি পার্শ্বশিক্ষকদের মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও কৃষিতে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের উপর নির্ভরতা
‘জীবন শক্তি’র অধীনে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে একাধিক প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে নতুন এইমস, মেডিক্যাল কলেজ, হাসপাতালের পরিষেবা উন্নয়ন এবং মেডিক্যাল ট্যুরিজম বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী ধনধান্য কৃষি যোজনা ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিল্পায়নে নতুন নীতি
‘শিল্প শক্তি’র মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ব ভারতের শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্প স্থাপনে ইনসেনটিভ, লাইসেন্স প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং পুরনো জমি সংক্রান্ত আইন পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
বিতর্কে সংখ্যালঘু উন্নয়ন বরাদ্দ
বাজেটের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হল সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো। গত অর্থবর্ষে যেখানে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৫,৭১৩ কোটি টাকা, সেখানে নতুন বাজেটে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩,১৬৫ কোটিতে।
আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী এই সিদ্ধান্তকে ‘সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বঞ্চনা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে বাম ও তৃণমূলও বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে সরকারের দাবি, আর্থিক সংকটের মধ্যেও কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও পরিকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েই এই বাজেট তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু এখন দেখার তা বাস্তবে তা কতটা রুপায়িত হয় আগামী সময়ই এর উত্তর খুঁজবে।