কর না বাড়িয়েই কোষাগার ভরানোর লক্ষ্য, বাংলার জন্য ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর প্রস্তাব নতুন অর্থমন্ত্রীর
পশ্চিমবঙ্গের নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরই রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করলেন রাসবিহারীর বিজেপি বিধায়ক স্বপন দাসগুপ্ত। রাজ্যের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘উজ্জ্বল নয়’ বলে উল্লেখ করলেও, সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য একাধিক সম্ভাব্য পথের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করের বোঝা চাপিয়ে নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করেই কোষাগার সমৃদ্ধ করতে হবে।
‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, ট্যাক্স না বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো’
দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় অর্থমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে করের হার না বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধির পথ খুঁজে বের করা।
তাঁর মতে, শুধুমাত্র কর বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহের পুরনো ধারণা এখন আর কার্যকর নয়। বরং করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক করে তোলার মধ্যেই রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
অন্নপূর্ণা যোজনার বিপুল ব্যয়, তবু পিছিয়ে নয় সরকার
সামনেই রাজ্যের নতুন বাজেট। বিধানসভা নির্বাচনের পর মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। বিশেষ করে অন্নপূর্ণা যোজনার ভাতা ২,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা করার ফলে প্রতি মাসে বিপুল আর্থিক ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে রাজ্যকে।
এই প্রসঙ্গে স্বপন দাসগুপ্ত বলেন, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলিকে সফলভাবে চালিয়ে যেতে হলে রাজ্যের সামগ্রিক অর্থনীতিরও উন্নতি ঘটাতে হবে। অর্থনীতিকে শক্তিশালী না করে দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের প্রকল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
একইসঙ্গে তিনি জানান, প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের তালিকা আরও নির্ভুল ও লক্ষ্যভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে প্রকৃত প্রাপকরাই সুবিধা পান এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো যায়।
ঋণের বোঝা কাটাতে ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর প্রস্তাব
রাজ্যের বিপুল ঋণভার এবং সুদের চাপকে একটি ‘দুষ্টচক্র’ বলে বর্ণনা করেছেন নতুন অর্থমন্ত্রী। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে কেন্দ্রের বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের পুনর্গঠনে মার্কিন সহায়তায় চালু হওয়া ঐতিহাসিক ‘মার্শাল প্ল্যান’-এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের জন্যও হয়তো অনুরূপ বিশেষ আর্থিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচির প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থমন্ত্রীর মতে, বর্তমানে রাজ্যের আয়ের বড় অংশ আবগারি শুল্ক এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হলে আয়ের উৎসকে বহুমুখী করা জরুরি।
কর বাড়ানো নয়, করের আওতা বাড়ানোর উপর জোর
স্বপন দাসগুপ্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, করের হার বৃদ্ধি নয়, বরং করের আওতা বৃদ্ধি করাই তাঁর লক্ষ্য। অর্থনীতির বহুল আলোচিত ‘ল্যাফার কার্ভ’-এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অনেক সময় অতিরিক্ত করের হার রাজস্ব বাড়ানোর বদলে উল্টো ক্ষতি ডেকে আনে।
তিনি জানান, জমির সরকারি মূল্যায়ন বা সার্কেল রেট আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল নজরদারি বৃদ্ধি এবং ই-গভর্ন্যান্স ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ করাই হবে তাঁর অগ্রাধিকার। এর মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
ডিএ ও আবগারি বিতর্কে এখনই মন্তব্য নয়
রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) সংক্রান্ত বিষয় কিংবা বহুল আলোচিত আবগারি দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এখনই কোনও চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চাননি অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিষয়গুলি অত্যন্ত জটিল এবং সেগুলি নিয়ে এখনও বিস্তারিত প্রশাসনিক আলোচনা হয়নি।
তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উত্তরবঙ্গ সফর দিয়ে শুরু মাঠপর্যায়ের কাজ
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন অংশের ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং অংশীদারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে জোর দিচ্ছেন নতুন অর্থমন্ত্রী। সেই লক্ষ্যেই তিনি উত্তরবঙ্গ সফরে যাচ্ছেন।
শিলিগুড়ির ব্যবসায়ী মহল, চা শিল্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করবেন তিনি। প্রশাসনিক দপ্তরে বসে নয়, বরং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই রাজ্যের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার রূপরেখা তৈরি করতে চান বলে জানিয়েছেন স্বপন দাসগুপ্ত।
নজরে নতুন অর্থনৈতিক দিশা
রাজ্যের আর্থিক সংকট, বিপুল ঋণভার, সামাজিক প্রকল্পের ব্যয় এবং রাজস্ব বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে কঠিন সময়ের মধ্যেই দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন অর্থমন্ত্রী। তবে কর না বাড়িয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং কেন্দ্রের সহায়তায় অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর যে রূপরেখা তিনি তুলে ধরেছেন, তা আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিশা হয়ে উঠতে পারে।