কালীঘাট থেকে ফের ‘লড়াইয়ের ডাক’, স্মৃতির সিঙ্গুর আর বর্তমানের রাজনৈতিক বাস্তবতা
কলকাতার কালীঘাটে মনীষীদের মূর্তিতে মাল্যদান, মায়ের মন্দিরে পুজো এবং তারপর গণতন্ত্র রক্ষার বার্তা। এই দৃশ্য যেন অনেকের মনেই ফিরিয়ে আনল দুই দশক আগের সেই আন্দোলনের দিনগুলিকে, যখন রাজ্যের পথে-ঘাটে প্রতিধ্বনিত হতো—“লড়াই করো, লড়াই করো”।
একসময় এই স্লোগান শুধু একটি রাজনৈতিক আহ্বান ছিল না, ছিল বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক প্রতীক। সিঙ্গুরের মাঠে, গ্রামীণ জনপদে, কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলনে সেই ডাক পৌঁছে গিয়েছিল সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। দোলা সেনের কণ্ঠে আন্দোলনের গান, মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃপ্ত উপস্থিতি এবং কৃষকদের প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক আবহ।
সিঙ্গুরের সেই দিনগুলো
সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। মহিলারা ঝাঁটা হাতে, কৃষকরা নিজেদের জমি বাঁচানোর দাবিতে, আর আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তখন তাঁর ডাকেই গ্রাম থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতেন। আন্দোলনের মঞ্চে দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই আন্দোলনই পরবর্তীতে বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি করেছিল।
ক্ষমতা থেকে বিরোধী রাজনীতির পথে
সময়ের চাকা ঘুরেছে। রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণও বদলেছে। আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা যাচ্ছে অন্য এক ভূমিকায়। যিনি একসময় শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মুখ ছিলেন, তিনি এখন আবার বিরোধী রাজনীতির ময়দানে গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্ন তুলে পথে নামছেন।
তাঁর বক্তব্য, বাংলার গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিপন্ন এবং সেই কারণেই মানুষের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। সেই লক্ষ্যেই মাঝে মধ্যেই তাঁকে দেখা যাচ্ছে রাস্তায়, সভা-মিছিলে এবং জনসংযোগ কর্মসূচিতে।
সঙ্গী কমেছে, লড়াই থামেনি
রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় অনেক পুরনো সহযোদ্ধা আজ আর তাঁর পাশে নেই। কেউ রাজনৈতিক মতপার্থক্যে, কেউ নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেদের অবস্থান বদলেছেন। ফলে একসময়ের বিশাল রাজনৈতিক বলয়ের তুলনায় এখন তাঁর চারপাশে মানুষের সংখ্যা কম বলে বিরোধীদের দাবি।
তবে তৃণমূল নেত্রী এখনও বিশ্বাস করেন, বাংলার রাজনীতিতে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই কারণেই তাঁকে এখনও দেখা যায় রাস্তায় নেমে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে, দলীয় কর্মীদের উৎসাহ দিতে এবং পুরনো সংগ্রামের স্মৃতি উসকে দিতে।
পুরনো স্লোগান, নতুন বাস্তবতা
“লড়াই করো, লড়াই করো”—এই স্লোগান একসময় বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছিল। আজও সেই একই স্লোগান শোনা যায় তাঁর বক্তব্যে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি এবং সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়কার বাস্তবতার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে।
আজকের বাংলায় রাজনৈতিক লড়াই শুধু মাঠে-ময়দানে নয়, সামাজিক মাধ্যম, সংগঠন এবং জনমতের ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পুরনো আন্দোলনের আবেগকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
মমতার ভরসা এখনও ‘পথ’
সমালোচনা, রাজনৈতিক চাপ এবং দলীয় ভাঙনের জল্পনা—সবকিছুর মধ্যেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির মূল দর্শন এখনও একই রয়েছে বলে তাঁর অনুগামীদের দাবি। মানুষের মধ্যে থাকা, রাস্তায় থাকা এবং আন্দোলনের রাজনীতিকে জীবিত রাখা।
সেই কারণেই কালীঘাটে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন ও পুজোর কর্মসূচির পরেও তাঁর বার্তা ছিল স্পষ্ট—লড়াই চলবে।
একসময়ের অগ্নিকন্যা এখনও বিশ্বাস করেন, পথেই রাজনীতির শক্তি, পথেই মানুষের সমর্থন, আর পথেই হয়তো লুকিয়ে রয়েছে আগামী দিনের নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা।