রাজ্য রাজনীতিতে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে যখন প্রতি মুহূর্তে রাজনৈতিক তরজা অব্যাহত, ঠিক সেই আবহেই এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ধরা পড়ল রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্নে। কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ সমন্বয়ে আয়োজিত রেল সংক্রান্ত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিয়ে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সার্বিক উন্নয়নের বার্তাই দিলেন রাজ্যের শাসকদলের নেতা তথা মধ্যমগ্রামের বিধায়ক রথীন ঘোষ। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর উপস্থিতিতে নবান্ন সভাগৃহে আয়োজিত এই বিশেষ বৈঠকে তাঁর যোগ দেওয়া নিয়ে কোনও রকম রাজনৈতিক জল্পনার অবকাশ রাখতে চাননি তিনি। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, উন্নয়নের প্রশ্নে কোনও রাজনৈতিক বিভাজন থাকতে পারে না। রাজ্যের সরকার কোনও একটি নির্দিষ্ট দলের নয়, তা আপামর জনসাধারণের সরকার। সেই সরকারের ডাকে সাড়া দিয়ে এবং সর্বোপরি নিজের বিধানসভা এলাকার সাধারণ মানুষের স্বার্থেই তিনি এই প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত হয়েছেন।
নবান্নে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর সঙ্গে রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের এই মেগা বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক মহলে প্রথম থেকেই যথেষ্ট কৌতূহল ছিল। সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর সদর্প উপস্থিতি স্বভাবতই সকলের নজর কাড়ে। সেখানে তিনি স্পষ্ট জানান, যখন কোনও পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কথা আসে, তখন দলমত নির্বিশেষে সকলেরই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা উচিত। সরকারের ডাকা এই বৈঠকে তাঁর উপস্থিতির পিছনে রাজনীতির কোনও রং খোঁজা একেবারেই অর্থহীন। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজের এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দাবিদাওয়া, নিত্যদিনের যাতায়াতের ভোগান্তি এবং রেল পরিষেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন বৃহৎ প্রকল্পের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি রেলের শীর্ষ কর্তাদের কাছ থেকেই জানতেই তিনি নবান্নে এসেছেন। তাঁর মতে, কেন্দ্র ও রাজ্য— উভয় সরকারই মানুষের দ্বারা নির্বাচিত। তাই দুই সরকারের যৌথ উদ্যোগ, সমন্বয় ও সদিচ্ছাতেই এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের বকেয়া স্বপ্নগুলি বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব।
বৈঠকে মূলত কোন কোন বিষয়গুলি নিয়ে তিনি রেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন, সে প্রসঙ্গেও সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন মধ্যমগ্রামের বিধায়ক। শিয়ালদহ বনগাঁ শাখার নিত্যযাত্রীদের দুর্দশা এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার লাইফলাইন বলে পরিচিত রেল ও মেট্রো পরিষেবার সম্প্রসারণ নিয়ে তাঁর বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ইস্যু হল বহুল চর্চিত নোয়াপাড়া-বিমানবন্দর-বারাসত মেট্রো প্রকল্প। দীর্ঘদিন আগে এই মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও, জমি জট-সহ নানা প্রশাসনিক কারণে তা মাঝপথেই থমকে রয়েছে অথবা অত্যন্ত ধীর গতিতে এগোচ্ছে। যশোর রোডের নিত্যদিনের ভয়াবহ যানজট এড়িয়ে বিমানবন্দর থেকে বারাসত পর্যন্ত মেট্রোর কাজের জট কবে পাকাপাকিভাবে কাটবে এবং এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা আসলে কী, তা নিয়েই রেলমন্ত্রী ও রেলের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের কাছে তিনি জবাব চাইবেন বলে জানিয়েছেন। বারাসত, মধ্যমগ্রাম, হৃদয়পুর-সহ বিস্তীর্ণ এলাকার হাজার হাজার নিত্যযাত্রী প্রতিদিন এই মেট্রো প্রকল্পের দিকে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে রয়েছেন। যানজট এড়িয়ে দ্রুত ও নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য এই মেট্রো রুটটি বাস্তবায়িত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাই একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই প্রকল্পের কাজের দ্রুততা নিয়ে তিনি বৈঠকে জোরালো সওয়াল করবেন বলে স্থির করেছেন।
মেট্রো প্রকল্পের পাশাপাশি তাঁর নিজের বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত মধ্যমগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের সার্বিক আধুনিকীকরণের বিষয়টিও তিনি এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে উত্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী 'অমৃত ভারত স্টেশন' প্রকল্পের অধীনে ইতিমধ্যেই মধ্যমগ্রাম স্টেশনটিকে যুক্ত করা হয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে পুরনো স্টেশনের খোলনলচে সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার কথা। যাত্রীদের জন্য অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা, চলন্ত সিঁড়ি, উন্নত বিশ্রামাগার, উন্নত পরিকাঠামো, যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি এবং স্টেশনের সার্বিক সৌন্দর্যায়নের কাজ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই কাজ বর্তমানে ঠিক কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এর জন্য সাধারণ মানুষকে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে এবং কবে থেকে এলাকার মানুষ এই অত্যাধুনিক স্টেশনের সম্পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন, সেই বিষয়ে বিস্তারিত ও স্বচ্ছ তথ্য জানতেই তিনি নবান্নের এই বৈঠকে যোগ দিয়েছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, জনপ্রতিনিধিদের এই ধরনের গঠনমূলক মনোভাব রাজ্যের সার্বিক পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও দলীয় বাধ্যবাধকতা সরিয়ে রেখে প্রশাসনিক স্তরে কেন্দ্র ও রাজ্যের এমন যৌথ আলোচনা এবং সেখানে জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি নিজেদের এলাকার দাবিদাওয়া নিয়ে সরব হওয়া— আদতে সুস্থ ও পরিণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট যে, প্রশাসনিক মঞ্চে সাধারণ মানুষের বৃহত্তর স্বার্থ বিঘ্নিত হয় এমন কোনও আপস করতে রাজি নন তিনি। এখন দেখার, নবান্নের এই হাইভোল্টেজ বৈঠক থেকে উত্তর চব্বিশ পরগনার মেট্রো ও রেল পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য আগামী দিনে ঠিক কী সুনির্দিষ্ট ও ইতিবাচক সমাধান বেরিয়ে আসে।
কলকাতা
রাজনীতির ঊর্ধ্বে কেবলই উন্নয়ন, রাজ্যের ডাকে নবান্নের বৈঠকে যোগ দিয়ে মেট্রো ও স্টেশনের দাবি রথীনের
রাজ্য রাজনীতিতে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে যখন প্রতি মুহূর্তে রাজনৈতিক তরজা অব্যাহত, ঠিক সেই আবহেই এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ধরা পড়ল রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দফতর নবান্নে।