পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সামনে আসছে। এবার পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে প্রত্যাহার করা সিবিআই তদন্তের ‘সাধারণ সম্মতি’ (General Consent) পুনর্বহাল করল নবগঠিত বিজেপি সরকার। এর ফলে রাজ্যে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI)-এর কাজকর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার অবসান ঘটল বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
সোমবার রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের জারি করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৯৪৬ সালের দিল্লি স্পেশাল পুলিশ এস্টাব্লিশমেন্ট (DSPE) আইনের ৬ নম্বর ধারার আওতায় সিবিআইকে পুনরায় ‘সাধারণ সম্মতি’ প্রদান করা হয়েছে।
কী বদলাবে এই সিদ্ধান্তে?
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গে তদন্ত সংক্রান্ত বিষয়ে সিবিআইকে আর প্রতিটি ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের পৃথক অনুমতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। বিশেষত কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম বা অন্যান্য ফৌজদারি অভিযোগের তদন্তে কেন্দ্রীয় সংস্থা এখন সরাসরি পদক্ষেপ করতে পারবে।
তবে রাজ্যের নিজস্ব সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে আগের মতোই নির্দিষ্ট নিয়ম বহাল থাকছে। সেইসব ক্ষেত্রে তদন্ত শুরুর আগে রাজ্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৮ সালে কেন প্রত্যাহার করা হয়েছিল সম্মতি?
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বাধীন সরকার সিবিআইয়ের সাধারণ সম্মতি প্রত্যাহার করে নেয়। সেই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমবঙ্গে নতুন কোনো মামলা রুজু, তল্লাশি অভিযান বা তদন্ত শুরু করতে হলে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে পৃথকভাবে রাজ্যের অনুমতি নিতে হতো।
তৎকালীন সরকারের যুক্তি ছিল, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ‘রাজনৈতিক ব্যবহার’ রোধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে বিরোধীদের দাবি ছিল, একাধিক সংবেদনশীল তদন্ত থেকে প্রশাসনকে দূরে রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল বিতর্ক
সাধারণ সম্মতি প্রত্যাহারের পরও বিভিন্ন মামলায় সিবিআই তদন্ত চলতে থাকে। এ নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে আইনি সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পৌঁছায় Supreme Court of India-এ।
শুনানির সময় কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, কোনো রাজ্য সরকার সাধারণ সম্মতি প্রত্যাহারের ক্ষমতা রাখলেও তা তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা বা অভিযুক্তদের সুরক্ষা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। অন্যদিকে রাজ্যের পক্ষ থেকে যুক্তি ছিল, সংবিধান অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের বিষয় এবং সেই অধিকার রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও অতীতে একাধিক অবিজেপি শাসিত রাজ্য সিবিআইয়ের সাধারণ সম্মতি প্রত্যাহার করেছিল। ফলে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতায় আটকে যেত।
সেই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলির কাজের পরিসর যেমন বাড়বে, তেমনি রাজ্য-কেন্দ্র সম্পর্কের নতুন সমীকরণেরও ইঙ্গিত মিলছে।
রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের এই ধারাবাহিকতা আগামী দিনে আরও কী ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের।