ভোর থেকে শুরু হয়েছিল টানটান উত্তেজনা। দরজায় তালা ঝুলিয়ে ঘরের ভিতরে লুকিয়ে ছিলেন কলেজ স্ট্রিটের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মহম্মদ জসিমউদ্দিন। বাইরে অপেক্ষায় ছিল বিশাল পুলিশবাহিনী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডাকাডাকির পরও দরজা না খোলায় অবশেষে চাবিওয়ালা ডেকে তালা খুলিয়ে কাউন্সিলরকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রবিবার সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কলেজ স্ট্রিট ও কলাবাগান সংলগ্ন এলাকা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ জোড়াসাঁকো থানার পুলিশ কাউন্সিলরের বাড়িতে পৌঁছয়। বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে বাহিনী। আধিকারিকদের সন্দেহ ছিল, কাউন্সিলর বাড়ির ভিতরেই রয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা ও একাধিকবার ডাকাডাকির পরও কোনও সাড়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত তালা খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চাবিওয়ালার সাহায্যে সদর দরজা এবং কোলাপসিবল গেটের তালা খুলে ভিতরে প্রবেশ করেন পুলিশকর্মীরা। এরপর ঘর থেকে কাউন্সিলর মহম্মদ জসিমউদ্দিনকে বের করে নিয়ে আসা হয়। তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
কাউন্সিলরকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর সমর্থক ও ঘনিষ্ঠরা বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে পুলিশের গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও সেখানে জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিযোগের প্রতিবাদে এবং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ উগরে দিতে কাউন্সিলরকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করেন কয়েকজন বিক্ষোভকারী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে লাঠি উঁচিয়ে এগোতে দেখা যায় বাহিনীকে।
এই ঘটনার সূত্রপাত একটি পুরনো পকসো মামলাকে ঘিরে। ২০২৩ সালে কলেজ স্ট্রিট এলাকায় এক নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় কাউন্সিলর ও তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তদন্ত চলাকালীন নির্যাতিতার পরিবারকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল বলেও অভিযোগ ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার রাতে ওই নির্যাতিতা তরুণীকে একা পেয়ে কাউন্সিলর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে কটূক্তি করেন। প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ। তরুণীর উপর চড়, লাথি এবং শারীরিক হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
এছাড়াও, ঘটনার পর এলাকায় থাকা একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। এই সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতেই রবিবার সকালে পুলিশ অভিযান চালায়।
জোড়াসাঁকো থানার পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় কাউন্সিলর মহম্মদ জসিমউদ্দিন-সহ মোট দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসার আবহে এই গ্রেপ্তারি নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কলেজ স্ট্রিটের এই ঘটনায় এখন নজর রাজ্যের রাজনৈতিক মহল এবং প্রশাসনের।