নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-র বিরোধিতায় যখন গোটা দেশ উত্তাল হয়েছিল, তখন তার প্রবল আঁচ এসে পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গেও। সে দিনের সেই লাগামছাড়া বিক্ষোভ এবং সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনার ফাইল এবার নতুন করে খুলতে চলেছে রাজ্যের বর্তমান প্রশাসন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবার ২০১৯ সালের সেই সিএএ বিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত তাণ্ডবের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ওই সময় সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের মতো ধ্বংসাত্মক ঘটনায় যুক্ত অপরাধীদের কোনও মতেই রেয়াত করা হবে না। এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ বা ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তকে যথাযথ পদক্ষেপ করার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, পুরো বিষয়টি নতুন করে খতিয়ে দেখার জন্য রাজ্য পুলিশের অধীনে একটি ‘বিশেষ সেল’ বা স্বতন্ত্র তদন্তকারী দল গঠন করা হচ্ছে।
ফিরে যেতে হবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিতর্কের পর সংসদের দুই কক্ষ— লোকসভা এবং রাজ্যসভায় পাশ হয়েছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। এরপর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা পাকাপাকিভাবে আইনে পরিণত হয়। এই আইন কার্যকর হওয়ার পরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন অচিরেই এক চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক এবং হিংসাত্মক চেহারা নিয়েছিল বলে বিস্তর অভিযোগ ওঠে। প্রতিবাদীদের একাংশ রাজ্যের নানা প্রান্তে সরকারি সম্পত্তি, সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য যানবাহন এবং রেলের পরিকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। যথেচ্ছভাবে বাস ও ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দফতরেও নির্বিচারে ভাঙচুর চালানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে সেই সব ঘটনার বহু অভিযোগ পুলিশের খাতায়-কলমে বন্দি থাকলেও সেভাবে কোনও কঠোর আইনি পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলে প্রশাসনিক মহলের একাংশের মত। এবার সেই স্তূপাকার হয়ে থাকা অভিযোগের ফাইলগুলোই নতুন করে নাড়াচাড়া করতে চলেছে নবান্ন।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তকে মুখ্যমন্ত্রী কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ২০১৯ সালের ওই অশান্তির সময় সরকারি বা রেলের সম্পত্তি নষ্টের অভিযোগে যতগুলি এফআইআর বা অভিযোগ দায়ের হয়েছিল, তার প্রতিটির পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। এই বিপুল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্যই যে বিশেষ সেলটি গঠন করা হচ্ছে, তাদের প্রধান কার্যালয় বা দফতর তৈরি হবে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর এলাকায়। সেখান থেকেই গোটা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই সংক্রান্ত মামলাগুলির তদন্তপ্রক্রিয়া পরিচালনা করবেন উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকরা। তবে এই তদন্তে রাজ্য পুলিশ একা নয়, তাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করবে রেলপুলিশ বা জিআরপি। সেই উত্তাল সময়ে বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন বা ট্রেনের কামরায় লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিকাণ্ডের যে সমস্ত দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিল, তার যাবতীয় পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য এবং আনুষঙ্গিক নথি জিআরপি তুলে দেবে রাজ্য পুলিশের এই নবগঠিত বিশেষ সেলের হাতে।
প্রশাসনিক স্তরে ইতিমধ্যে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই বিশেষ সেলের তদন্তে যদি কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, তবে সরকার তার বিরুদ্ধে কড়া আর্থিক পদক্ষেপ করবে। ভাঙচুর হওয়া বা পুড়ে যাওয়া সরকারি সম্পত্তির সমতুল্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ সরাসরি সেই দোষী সাব্যস্ত অভিযুক্তের কাছ থেকেই আদায় করা হবে বলে প্রাথমিক ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রশাসনের এই কঠোর বার্তার পরেই নড়েচড়ে বসেছে রাজ্যের বিভিন্ন মহল।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের সেই ভয়ংকর দিনগুলিতে রাজ্যের মধ্যে সবথেকে বেশি হিংসা ও তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছিল হাওড়া এবং মুর্শিদাবাদ জেলায়। হাওড়ার উলুবেড়িয়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ উঠেছিল উন্মত্ত বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় উত্তেজিত জনতা খোদ থানাতেই অগ্নিসংযোগ করে এবং ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। সেই সব পুরনো ক্ষত এবং অমীমাংসিত অভিযোগের এবার আইনি সুরাহা করতে চাইছে রাজ্য সরকার। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নিলে বা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করলে যে পার পাওয়া যাবে না, মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশের মাধ্যমে রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে সেই কড়া বার্তাই পৌঁছে দিতে চাইছে বর্তমান প্রশাসন।
রাজ্য
সিএএ-বিক্ষোভে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, কড়া পদক্ষেপ রাজ্যের, তদন্তে নামছে বিশেষ সেল
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-র বিরোধিতায় যখন গোটা দেশ উত্তাল হয়েছিল, তখন তার প্রবল আঁচ এসে পড়েছিল পশ্চিমবঙ্গেও।