সময়ের অভাব, তাই কোনও 'প্রি-টেস্ট' ছাড়াই জনগণনা ২০২৭-এর কাজ শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে যখন জনগণনা ২০২৭-এর কাজ শেষ অথবা শেষ হওয়ার পথে তখন পশ্চিমবঙ্গে জনগণনা সংক্রান্ত কোনও পদক্ষেপ করাই সম্ভব হয়নি। রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার যখন জনগণনা সংক্রান্ত ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্ট্রার বা NPR ২০২১ তৈরির কাজ শুরুর নির্দেশিকা জারি করেছিল তখন এরাজ্যে সেই নির্দেশিকা পালিত হয়নি। গত বছরের ১৬ জুন জনগণনা ২০২৭ সংক্রান্ত গেজেট নোটিফিকেশন কেন্দ্রীয় সরকার প্রকাশ করলেও পূর্বতন রাজ্য সরকার তা নিয়েও যথেষ্ট গড়িমসি দেখায়। ফলে সার্বিকভাবে জনগণনার কাজে পিছিয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গ। অবশেষে গত ১১ মে পশ্চিমবঙ্গে জনগণনা সংক্রান্ত নোটিফিকেশন প্রকাশিত হয়। যেহেতু আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করার কথা তাই অন্য রাজ্যের মত 'প্রি-টেস্ট' না দিয়েই জনগণনার কাজ সম্পন্ন করতে বেশ বিপাকে রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তর।
বিশেষত যে দুটি পর্যায় এই জনগণনার কাজ হওয়ার কথা, তার প্রথমটি হল হাউস লিস্টিং বা হাউসিং সেন্সাস যা ২০২৬ সালের পয়লা এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা। ফলে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ করা এখন রাজ্য সরকারি আধিকারিকদের কাছে এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ সেল্ফ এনুমারেশন পর্ব বা বাড়ি বাড়ি সমীক্ষার কাজ শেষ করতে হবে পয়লা মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে। এরপর দেশের সেন্সাস কমিশনার মৃত্যুঞ্জয় কুমার নারায়ণ-এর নেতৃত্বে দেশজুড়ে জনগণনার মূল কাজ শুরু হবে। এই রাজ্যে জনগণনার কাজের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে থাকবে মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়াল এর নেতৃত্বাধীন রাজ্য স্তরের কমিটি। যে কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ডিরেক্টর সেনসাস অপারেশন রোশনি কমল এই যাবতীয় প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধান করবেন। অবশ্য শীতকালীন সমস্যার কারণে লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখন্ডে চলতি বছরের পয়লা অক্টোবর থেকেই জনগণনার মূল পর্ব শুরু হবে।
বস্তুত, জনগণনার উপর ভিত্তি করেই দেশের ও রাজ্যের যাবতীয় জনমুখী প্রকল্পের অনুদান ও সামাজিক প্রকল্প নির্ধারণ হযে থাকে। উন্নয়ন সূচক তৈরির ক্ষেত্রেও জনগণনার তথ্য অন্যতম উপাদান। শুধু তাই নয় জনগণনার উপর ভিত্তি করেই সংসদে ও রাজ্য বিধানসভাগুলিতে ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ বাস্তবায়িত হয়। এমনকি জনগণনার উপর ভিত্তি করেই লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলির সীমানা পুনর্ববিন্যাস হয়। এহেন গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে পূর্বতন রাজ্য সরকারের গাফিলতির কারণেই জনগণনার কাজে প্রাথমিক পর্বে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়ায় অন্য রাজ্যগুলোর মত এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় রি-চেক করার মত সুযোগ পাওয়া যাবে না এটা ধরে নিয়েই কপালে চিন্তার ভাঁজ রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের কর্তাদের। যেহেতু রাজ্যে রাজ্যে স্বরাষ্ট্র দপ্তরই জনগণনার ক্ষেত্রে নোডাল দপ্তর তাই অল্প সময়ের মধ্যে এই পাহাড় প্রমাণ কাজের চাপ কিভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়েই এখন ঘুম ছুটেছে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের। উল্লেখযোগ্য, কেন্দ্রীয় নির্দেশিকাকে মান্যতা দিয়েই
২০২০ সালের নির্দেশিকা মেনে একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল NPR তৈরির কাজ সম্পূর্ণ করাই নির্দিষ্ট সময়ের বেশ কিছুটা আগেই তারা জনগণনার কাজ শেষ করেছে। আন্দামান নিকোবর, দিল্লি, কর্ণাটক, লাক্ষাদ্বীপ, মিজোরাম, সিকিম এবং ওড়িশা ইতিমধ্যেই জনগণনার কাজ সম্পূর্ণ করেছে। চলতি মাসেই কাজ শেষের পথে বিহার, মধ্যপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, চণ্ডীগড়, ছত্তিশগডঢ়, হরিয়ানা ও অন্ধ্রপ্রদেশ। জুন ও জুলাই মাসের মধ্যেই অন্য প্রায় সব রাজ্যেই জনগণনার প্রাথমিক পর্বের কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। এমতাবস্থায় পশ্চিমবঙ্গে জনগণনার কাজ বেশ কিছুটা দেরিতে শুরু হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করা যে বড়সড় পরীক্ষার সামিল তা মনে করছে রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তর।
১৪০ কোটির দেশ ভারতে জনগণনার কাজে প্রায় ৩২ লক্ষ এনুমারেটর নিযুক্ত করা হয়েছে। যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনুমারেশনের কাজ করবেন। এরাজ্যে ২৭০০ জন ফিল্ড ট্রেনার প্রাথমিকভাবে বাড়ি বাড়ি এনুমারেশনের কাজ শুরু করবেন। আনুমানিক ৭০ জন মাস্টার ট্রেনার নিয়োগ করা হয়েছে যারা এই ফিল্ড ট্রেনারদের প্রশিক্ষিত করবেন। জানা গেছে, ভোটার তালিকার এসআইআর পর্বের এনুমারেশনে যে সমস্ত সরকারি কর্মীরা বিএলও হিসেবে কাজ করেছেন তাঁদের জনগণনার এনুমারেশনের কাজে নিযুক্ত করা হতে পারে। তবে কোনমতেই চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের এই কাজে যুক্ত করা যাবে না। যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ একটি ঘনবসতিপূর্ণ রাজ্য তাই এক একজন এনুমারেটরের ঘাড়ে ৮০০ জন নাগরিকের তথ্যপঞ্জির ভার দেওয়া হয়েছে। ৬ জন এনুমারেটর পিছু একজন করে সুপারভাইজারও নিযুক্ত থাকবেন।