বাংলার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো বাবা লোকনাথের তিরোধান দিবসের দিনেই। যে বিধানসভার অন্দরে এতদিন শাসক ও বিরোধীর সম্পর্ক ছিল সংঘাত, হট্টগোল এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের প্রতীক, সেখানে আজ এক নতুন সমীকরণের জন্ম হতে দেখা গেল। সারাদিন ধরে রাজনৈতিক নাটক, জল্পনা এবং সাংবাদিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে রাজ্যের মানুষ প্রত্যক্ষ করলেন এক নতুন বিরোধী শক্তির আত্মপ্রকাশ।
একদা বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং পরে তৃণমূলের রাজনীতিতে উঠে আসা নেতাদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন বিরোধী শিবিরের বক্তব্য স্পষ্ট—বিজেপিকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়া হবে না। নতুন বিরোধী দলের নেতার দাবি, তাঁরা বিজেপির বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রেও আপত্তি নেই বলে ইঙ্গিত মিলেছে। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্ন রয়ে গেছে।
কিন্তু এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই নতুন বিরোধী দল কি সত্যিই বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারবে?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের প্রধান কাজ হলো সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা, জনগণের স্বার্থে প্রশ্ন তোলা, বিতর্ক সৃষ্টি করা এবং শাসককে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানো। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একসময় জ্যোতি বসু বনাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বনাম মমতার রাজনৈতিক সংঘর্ষ ছিল রীতিমতো ঐতিহাসিক।
কিন্তু ২০২৬ সালের রাজনীতির ছবি যেন সম্পূর্ণ আলাদা। শুভেন্দু অধিকারী আজ আর বিরোধী নন, তিনি রাজ্যের শাসক। আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এসেছে নব তৃণমূল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—নতুন বিরোধীরা কি সত্যিই বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভূমিকা নেবে, নাকি তারা হবে তথাকথিত ‘তালশাঁস মার্কা বিরোধী দল’, যারা বিরোধিতার চেয়ে সমঝোতার রাজনীতিতেই বেশি আগ্রহী?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শাসক ও বিরোধীর সম্পর্ক অতীতের মতো সাপে-নেউলে নয়। বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন অনেক বেশি কৌশলনির্ভর। বিরোধী দলকে কিছুটা রাজনৈতিক পরিসর দিয়ে নিজেদের বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করার কৌশল গ্রহণ করেছে বিজেপি। এর ফলে মূল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা সহজ হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে অনেকেরই মনে পড়ে যায় প্রয়াত মুকুল রায়ের সেই বহুল আলোচিত মন্তব্য—‘যাহা বিজেপি তাহাই তৃণমূল’। তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্নের অন্যতম সংগঠক মুকুল রায় বহু আগেই দলীয় গণতন্ত্রের অভাবের অভিযোগ তুলে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। আজ যখন নব তৃণমূলের নেতারা গঠনমূলক বিরোধিতার কথা বলছেন, তখন সেই পুরনো মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসছে।
নব তৃণমূলের বক্তব্য, বিরোধিতা মানেই শুধু হট্টগোল নয়; জনগণের স্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করাও বিরোধী রাজনীতির অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, যাঁরা খুব সহজেই বিরোধী দলের মর্যাদা, বিধানসভায় অফিস এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়ে গেলেন, তাঁরা কতটা স্বাধীনভাবে সরকারের বিরুদ্ধে লড়তে পারবেন?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর মিলবে। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট যে বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের পর বিরোধী শিবিরের পুনর্গঠন এবং বিজেপির কৌশলগত রাজনৈতিক সাফল্য পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছে।
এই নতুন বিরোধী দল কি সত্যিই সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে, নাকি তালশাঁসের মতো বাইরে শক্ত অথচ ভিতরে নরম বিরোধিতার রাজনীতি করবে—সেই উত্তরই এখন খুঁজছে বাংলার মানুষ।