রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে থাকা কিংবা ধীরগতিতে চলা উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল নবান্ন। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া কমাতে বিভিন্ন সরকারি দফতরের আর্থিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে রাজ্যের অর্থ দফতর। এর ফলে বহু প্রকল্পের ক্ষেত্রে আর অর্থ দফতরের অনুমোদনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে না সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে।
শুক্রবার রাজ্য সরকারের অর্থ দফতরের অডিট ব্রাঞ্চ (গ্রুপ-টি) একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। সরকারি সূত্রে খবর, জনকল্যাণমূলক ও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন (Administrative Approval) এবং আর্থিক মঞ্জুরি (Financial Sanction) দ্রুত দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আগেও বাড়ানো হয়েছিল ক্ষমতা
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই এবং অক্টোবর মাসেও বিভিন্ন দফতরের আর্থিক ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। তবে পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্প সংক্রান্ত ফাইল অর্থ দফতরে এসে অনুমোদন পেতে সময় নিচ্ছে। ফলে উন্নয়নমূলক কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও গতিশীল করতে আর্থিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে জোর দিল নবান্ন। সরকারি মহলের মতে, উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিকে আরও বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছিল।
কোন দফতর কত টাকা পর্যন্ত অনুমোদন দিতে পারবে?
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, রাজ্যের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ দফতর এখন থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যের প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুমোদন নিজেদের স্তরেই দিতে পারবে।
এই দফতরগুলি হল—
পূর্ত দফতর (PWD)
সেচ ও জলপথ দফতর (Irrigation & Waterways)
জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর (PHE)
জলসম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়ন দফতর (WRID)
নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দফতর (UDMA)
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতর (Health & Family Welfare)
পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতর (P&RD)
ফলে গ্রামীণ রাস্তা, পানীয় জল, হাসপাতাল, পুর পরিকাঠামো এবং গ্রামীণ উন্নয়নের বহু প্রকল্প এখন অনেক দ্রুত অনুমোদন পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল ও সুন্দরবনের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব
প্রান্তিক ও ভৌগোলিকভাবে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী—
উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর (NBDD)
পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন বিষয়ক দফতর (PUAD)
সুন্দরবন বিষয়ক দফতর
এখন থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রকল্পের অনুমোদন সরাসরি দিতে পারবে।
এর ফলে পাহাড়, জঙ্গলমহল এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে বলে প্রশাসনের আশা।
অন্যান্য দফতরের জন্য নতুন সীমা
উপরোক্ত দফতরগুলি ছাড়া রাজ্যের অন্যান্য প্রশাসনিক দফতরগুলির ক্ষেত্রে আর্থিক অনুমোদনের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫ লক্ষ টাকা।
ফলে অপেক্ষাকৃত ছোট ও মাঝারি প্রকল্পগুলিও দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে।
থাকছে কড়া আর্থিক নজরদারি
যদিও আর্থিক ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে, তবুও সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
অর্থ দফতরের নির্দেশিকা অনুযায়ী—
প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট দফতরের ফিনান্সিয়াল অ্যাডভাইজারের সম্মতি বাধ্যতামূলক।
বাজেট বরাদ্দের মধ্যে থেকেই প্রকল্প অনুমোদন করতে হবে।
শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বাজেট বহির্ভূত কোনও প্রকল্প অনুমোদন করা যাবে না।
উন্নয়নের গতি ও আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্যে ভারসাম্য
প্রশাসনিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়াবে, তেমনই আর্থিক শৃঙ্খলাও বজায় রাখবে। প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে অযথা বিলম্ব কমবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত সরকারি পরিষেবার সুবিধা পাবেন।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাজ্যের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করার পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই নবান্নের এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ আগামী দিনে বড় ভূমিকা নিতে পারে।