রাজ্যে পালাবদলের পর এই প্রথমবার নবান্নে এলেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন তিনি। আর সেই বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিলেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। বিগত সরকারের আমলে রাজ্যে রেলের কাজ করতে গিয়ে পদে পদে যে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে, সে কথাই এদিন বারবার উঠে আসে রেলমন্ত্রীর বক্তব্যে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে পাশে বসিয়ে রেলমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা, "আগের সরকার উন্নয়ন রুখতে শুধু কোর্টে যেত, এবার আপনারা মন খুলে কাজ করুন।"
এদিন নবান্নে রেলমন্ত্রী স্পষ্ট অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে বাংলায় উন্নয়নের কাজ কার্যত আটকে রাখা হয়েছিল। পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সাহায্য তো দূর, বরং সরকার নিষ্ক্রিয় থেকেছে। রেলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট স্রেফ রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার কারণে ধাক্কা খেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কলকাতা মেট্রোর চিংড়িঘাটা কাজ আটকে থাকার কথা তুলে ধরেন তিনি। রেলমন্ত্রী জানান, কলকাতা পুলিশ যেভাবে ডাইভার্শনের কথা বলেছিল, সেভাবেই পরিকল্পনা করা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী সরকার অনুমতি দেয়নি। এমনকি কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশও তারা মানেনি। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ যাতে মেট্রোর সুবিধা না পায়, তার জন্য আগের সরকার সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। রেলমন্ত্রীর কথায়, আগের সরকার ছিল আদ্যোপান্ত উন্নয়ন বিরোধী এবং তারা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ককে অত্যন্ত খারাপ জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল।
তবে রাজ্যে পালাবদলের পর সেই চিত্র যে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে, এদিন তা স্পষ্ট করে দেন রেলমন্ত্রী। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রী নিজে থেকে উদ্যোগ নিয়ে সমস্ত রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। রেলমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে রেল সেক্টরে ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ হতে চলেছে। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ইউপিএ সরকারের আমলে রেলওয়ে বাংলার জন্য মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা পেত, সেখানে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষেই বাংলার জন্য ১৪ হাজার ২০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। একইসঙ্গে তিনি জানান, আগামী ৫ বছরে কলকাতা মেট্রোর জন্য ৬০টি নতুন প্রজন্মের ট্রেন চালু করা হবে। এছাড়াও দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত বুলেট ট্রেন এবং ডানকুনি থেকে শুরু করে সুরাট পর্যন্ত একটি পূর্ব-পশ্চিম ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর তৈরির মতো বড় প্রকল্পের ঘোষণাও করেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, রেলমন্ত্রীর এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিগত তৃণমূল সরকারের সময় বারবার রেলের কাজ করতে গিয়ে জমি জটে আটকে পড়তে হয়েছে কেন্দ্রকে। কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের জেরে থমকে থেকেছে একের পর এক উড়ালপুল, আন্ডারপাস বা স্টেশন আধুনিকীকরণের কাজ। কিন্তু বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আটকে থাকা ৭০টিরও বেশি রেলওয়ে ওভারব্রিজ ও আন্ডারব্রিজের এনওসি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে উন্নয়নের ক্ষেত্রে কোনও আপস করা হবে না। রেলমন্ত্রী আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে তাই জোর গলায় বলেছেন, কাগজপত্রের জট বা এনওসি না পাওয়ার দিন শেষ। জমি অধিগ্রহণের সমস্যাও মিটতে শুরু করেছে। ডাবল ইঞ্জিনের সরকার এখন সঠিকভাবে কাজ করছে, তাই আর কোনও বাধা নেই। রাজ্যের মানুষের সুবিধার্থে পরিকাঠামো উন্নয়নে আধিকারিকদের এখন থেকে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে দ্রুততার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। এদিন এই যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে সঙ্গে নিয়ে চিংড়িঘাটায় মেট্রোর কাজ দেখতেও যান রেলমন্ত্রী।