রাজ্য বিধানসভার অধিবেশনে এবার প্রকাশ্যেই সামনে এল তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। গুন্ডা দমন বিল নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দিন বক্তা তালিকা ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা শুধু বিধানসভার পরিবেশই উত্তপ্ত করেনি, বরং শাসক শিবিরের অন্দরের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
সূত্রের খবর, বর্তমানে বিধানসভার বিরোধী শিবিরে থাকা তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত দুটি আলাদা গোষ্ঠীতে বিভক্ত। একদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী, অন্যদিকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন কালীঘাট শিবির। আর এই দুই শিবিরের টানাপোড়েনই এদিন প্রকাশ্যে চলে আসে।
বক্তা তালিকা ঘিরেই শুরু বিতর্ক
বিধানসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, গুন্ডা দমন বিলের উপর আলোচনার জন্য কালীঘাট শিবিরের তরফে কুণাল ঘোষের নাম প্রস্তাব করেছিলেন পরিষদীয় দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু চূড়ান্ত বক্তা তালিকা প্রকাশের সময় সেই নাম বাদ দিয়ে তালিকায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম রাখা হয়।
এই পরিবর্তন ঘিরেই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক।
অধ্যক্ষের সামনে আপত্তি শোভনদেবের
বিলের উপর বক্তব্য রাখতে ডাক পড়তেই শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় নিজের বক্তব্য শুরু না করে সরাসরি অধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দলের তরফ থেকে কুণাল ঘোষের নাম পাঠানো হলেও তালিকায় তা পরিবর্তন করা হয়েছে।
তিনি অনুরোধ করেন, তাঁর নির্ধারিত সময় কুণাল ঘোষকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হোক।
শোভনদেবের এই বক্তব্যের পরই বিধানসভায় হইচই শুরু হয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার হস্তক্ষেপ করেন অধ্যক্ষ।
সরকারের আপত্তি
এই আবেদনের বিরোধিতা করেন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। তিনি জানান, একবার বক্তা তালিকা চূড়ান্ত হয়ে গেলে অধিবেশন চলাকালীন তা পরিবর্তনের সুযোগ নেই।
পরে পরিষদীয় মন্ত্রী শংকর ঘোষও একই অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলের কোন সদস্য বক্তব্য রাখবেন, তা নির্ধারণের দায়িত্ব বিরোধী দলের মুখ্য সচেতকের। সরকার বা অধ্যক্ষ সেই তালিকা পরিবর্তন করেন না।
তাঁর বক্তব্য, যদি বিরোধী দলের ভিতরে কোনও মতভেদ থাকে, তবে তা তাদের নিজেদের মধ্যেই মিটিয়ে নিতে হবে।
বক্তব্য না রেখেই বসে পড়লেন শোভনদেব
সরকারের ব্যাখ্যার পরও শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় নিজের বক্তব্য আর রাখেননি। প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি নিজের আসনে বসে পড়েন। ফলে গুন্ডা দমন বিল নিয়ে কালীঘাট শিবিরের অবস্থান আর বিধানসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।
সংশোধনী জমা দিয়েও নীরব কুণাল
এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক, গুন্ডা দমন বিলে সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিয়েও শেষ পর্যন্ত একটি শব্দও বলার সুযোগ পাননি বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ।
উল্লেখ্য, অধিবেশন শুরুর আগেই তিনি বিজেপি সরকারের আনা এই আইনকে 'রাওলাট আইন'-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। কিন্তু বক্তা তালিকায় নাম না থাকায় কেন তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন, তার ব্যাখ্যা আর বিধানসভায় শোনা যায়নি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, গোটা ঘটনাই তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। বক্তা তালিকা নিয়ে এমন প্রকাশ্য মতবিরোধ বিরোধী শিবিরের সাংগঠনিক অবস্থান নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।