মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়: রাজনীতির ময়দানে সংগ্রাম, সমঝোতা ও টিকে থাকার কাহিনি
কলকাতা: রাজনীতির ইতিহাসে কিছু ছবি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শুধুমাত্র ছবি থাকে না, হয়ে ওঠে একটি যুগের প্রতীক। কিছু মুহূর্ত, কিছু সম্পর্ক এবং কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেতাদের জীবনের পাশাপাশি একটি রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসকেও সংজ্ঞায়িত করে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনও এমন অসংখ্য স্মৃতি, সাফল্য, বিতর্ক এবং কৌশলগত সিদ্ধান্তের সাক্ষী।
১৯৮৪ সালে কংগ্রেসের তরুণ নেত্রী হিসেবে তিনি যখন বর্ষীয়ান বাম নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন, তখনই জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর উত্থানের সূচনা হয়। সেই জয় তাঁকে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তী সময়ে কংগ্রেসের সঙ্গে মতপার্থক্য বাড়তে থাকলে তিনি নিজের রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পথে হাঁটেন এবং জন্ম হয় তৃণমূল কংগ্রেসের।
জোট রাজনীতির বাস্তবতা
ভারতের জোট রাজনীতির ইতিহাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা বরাবরই আলোচিত। একসময় তিনি অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের অংশ ছিলেন। পরে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলালে ইউপিএ জোটের সঙ্গেও যুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে তাঁর এই অবস্থান পরিবর্তনকে কেউ রাজনৈতিক বাস্তবতা বলেছেন, আবার সমালোচকেরা একে সুবিধাবাদী রাজনীতি বলেও ব্যাখ্যা করেছেন।
তবে সমর্থকদের দাবি, আঞ্চলিক দলের অস্তিত্ব রক্ষা এবং বাংলার স্বার্থকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
২০১১: বাংলার রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পালাবদল
দীর্ঘ আন্দোলন, বিশেষ করে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের পর ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে। কংগ্রেসের সহযোগিতায় ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেকেই "পরিবর্তনের মুখ" হিসেবে দেখেছিলেন।
এরপর টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। প্রশাসনিক সাফল্য, জনমুখী প্রকল্প এবং সাংগঠনিক শক্তির মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেন।
সাফল্যের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও
তবে রাজনীতির পথ কখনও সরল নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দলের একাধিক নেতা, সাংসদ এবং মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, দলত্যাগ এবং সাংগঠনিক অস্থিরতা তৃণমূলের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার ফলে যে ধরনের চাপ এবং বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়, তৃণমূলও এখন সেই বাস্তবতার সম্মুখীন।
সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সেই ছবি কেন আলোচনায়?
সম্প্রতি বিরোধী শিবিরের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সোনিয়া গান্ধীর একটি ছবি রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের প্রয়োজনে পুরনো দূরত্ব ভুলে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই; প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক ও সমীকরণ বদলায়। সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যায় এই ধরনের ছবিতে।
ক্ষমতা, কৌশল ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে মতভেদ যতই থাকুক, একটি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রায় সকলেই একমত— তিনি ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতা। রাস্তার আন্দোলন থেকে রাজ্যের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর তাঁর যাত্রা ভারতীয় রাজনীতির এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি "বাংলার অগ্নিকন্যা", বিরোধীদের কাছে তিনি বিতর্কিত রাজনৈতিক কৌশলের প্রতীক। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার জন্য।
রাজনীতির ময়দানে সময়ের সঙ্গে সমীকরণ বদলায়, জোট বদলায়, সম্পর্ক বদলায়। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক গল্পগুলো আগামী দিনেও ভারতীয় গণতন্ত্রের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে থাকবে।