"ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে" রচনায় আচার্য জগদীশচন্দ্র লিখেছেন "নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?" নদীর উত্তর,"আমি যথা হইতে আসিয়াছি তথায় ফেরৎ যাই।" মূলত, গঙ্গা বা ভাগীরথীর ভাঙা-গড়ার সঙ্গে ভারতীয় রাজনীতিতে জাতীয় কংগ্রেসের পথচলার সাদৃশ্য যথেষ্ট। নদী যেমন এপার ভেঙে ওপার গড়ে ঠিক তেমনই ১৪০ বছরের কংগ্রেস যতবার ভেঙেছে ততবার নিজের মত করে গড়ে নিয়েছে। কখনও শক্তি ক্ষীণ হয়েছে আবার কখনও নতুনভাবে ফিরে এসেছে রাজনীতি তথা ক্ষমতার অলিন্দে। আর ভাঙা-গড়ার নিয়ম মেনেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া কংগ্রেস যেন ফের প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সৌজন্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। '৯৮ সালে মূল কংগ্রেস থেকে ছিন্ন হয়ে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি করে বাংলার অগ্নিকন্যা হয়ে যিনি রাজত্ব লাভ করেছিলেন আজ তিনিই চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো নীরবে 'ঘর ওয়াপসি'র পথে ?! ফলে ঘর ভেঙে ঘরে ফেরা নিয়ে স্বাভাবিক প্রশ্নও উঠেছে।
তবে বিজ্ঞানের যুক্তি অনুযায়ী অনু ভেঙেই তো পরমাণুর সৃষ্টি যা দিয়ে তৈরি হয় নতুন পদার্থ। অর্থাৎ, নতুন করে শক্তির সোপান যা ভাঙা-গড়ার চক্রেই আবর্তিত। ২০০৯ সালে কৃষ্ণনগরে জাতীয় কংগ্রেসের চিন্তন শিবিরে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। "জাতীয় কংগ্রেস হলো ভাগীরথীর মতোই বহমান ঐতিহ্য। পথ চলতে চলতে একদিকে ভাঙে আবার অন্যদিকে গড়ে। কিন্তু তাতে ভাগীরথীর ঐতিহ্য কমে না, সে আপন মনে নিজের বৈশিষ্ট্যে এগিয়ে চলে" প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির সেদিনের এই বক্তব্য যেন জাতীয় কংগ্রেস ও তৃণমূল নেত্রীর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যথেষ্ট মানানসই।
বস্তুত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় 'মূল' ঘরে ফিরবেন না ছিন্ন'মূল' রয়ে যাবেন তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে গত দু'দিনে দিল্লিতে মূল-ছিন্নমূলের যে রাজনৈতিক ছবিটা প্রকাশ্যে এসেছে তা অবশ্যই অর্থবহ।
৬৬-৬৭ সালে অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেস, '৭৮ সালে ইন্দিরা কংগ্রেস, '৮৫ সালে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সমাজবাদী কংগ্রেস, বারবার জাতীয় কংগ্রেস ধাক্কা খেয়েছে। তবে '৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি পদের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ভি ভি গিরি ও সঞ্জীবা রেড্ডিকে নিয়ে কংগ্রেসের ভাঙনকে জাতীয় স্তরে কংগ্রেসের প্রথম বড় ভাঙন বলে ধরা হয়। তবে 'ঘরছাড়া' যারা ফের মূল ছাতার তলায় ফিরেছেন তাঁরা বরং শক্তি সঞ্চয় করেছেন। জাতীয় কংগ্রেসের চরকা যুক্ত তেরঙা পতাকা সরিয়ে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতীক চিহ্ন হিসেবে ইন্দিরা কংগ্রেসের হাত চিহ্নই
প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিছুটা মুল্য চুকিয়ে 'ঘরে' ফিরে শেষ পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের মনোনীত রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। অজয় মুখোপাধ্যায় অবশ্য কংগ্রেসে ফেরেননি। '৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হয়ে প্রথমে এনডিএ-র রেলমন্ত্রী পরে কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে ৩৪ বছরের বাম জমানা হটিয়ে ফের কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে একলা চলার সিদ্ধান্ত নেন মমতা। বঙ্গীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসকে 'শূন্য' করে টানা দেড় দশক রাজত্ব করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৬-এ ছবি বদলেছে। পদ্ম ঝড়ে বেসামাল হয়ে খুঁটি নড়ে গেছে জোড়া ফুলের। তবুও ৪২ শতাংশ ভোটব্যাঙ্ক এবং ৮০ জন বিরোধী বিধায়কের বিরোধিতার শক্তি কম নয়। কিন্তু নির্বাচনী ফল বেরোনর পর সংসদীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের অন্দর ভেঙে চুরমার। বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের আদর্শ লঘু হয়ে বিরোধীপক্ষের অধিকাংশ "শাসকের অঙ্গ" হয়ে পড়ায় রাজ্যে বিরোধী রাজনীতিতে এখন অস্তিত্ব সঙ্কট। পরিস্থিতি যা তাতে দলীয় প্রতীক নিজের কাছে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ মমতার কাছে। সেকারণেই নিজেকে 'পরাজিত' বলে মেনে না নিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জায়গাটা তৈরি রেখেছেন রাজনৈতিক দর্শনেই।
এই অবস্থায় হারানো জমি ফিরে পেতে 'ঘর ওয়াপসি'র পথেই হেঁটেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। যিনি ঘোষণা করেছিলেন "আসল কংগ্রেস" হল তৃণমূল, তিনিই আজ অস্তিত্ব রক্ষায় জাতীয় কংগ্রেসকেই "আসল" ঘর বলে মান্যতা দিতে চান। পক্ষান্তরে, রাজ্য রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হতে এবং বিজেপি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ৪২ শতাংশ জনসমর্থন দখলে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাছে টেনে নিতে ভুল করেনি কংগ্রেস হাইকম্যান্ড। জাতীয় স্তরে একের পর এক রাজ্যে বিজেপির জয়রথ বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিরোধী পশ্চিমবঙ্গেও গেরুয়া ঝড় যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে অতীত তিক্ততা দূরে সরিয়ে আপাতত পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিজেপি বিরোধী রাজনীতিতে মমতার 'বিরোধী' ব্র্যান্ড কাজে লাগাতে চায় কংগ্রেসও। যদিও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে , তৃণমূলের অধঃপতনের নেপথ্যে দায়ি তৃণমূল কংগ্রেসই। তবে দুর্নীতি দমনের নাম করে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী
কলকাতা থেকে দিল্লি পর্যন্ত
তৃণমূলের ভাঙন যেভাবে ত্বরান্বিত হচ্ছে তাতে বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত করা হচ্ছে বলেই অভিমত।