বিশেষ প্রতিবেদন
উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা স্টেশনের সেই রাত আজও ভুলতে পারেনি সুঁটিয়া। আপ বনগাঁ লোকাল থেকে নেমে নিজের মোটরবাইকের দিকে এগোচ্ছিলেন শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ওঁৎ পেতে ছিল আততায়ীরা। স্টেশন চত্বরেই কাছ থেকে গুলি করা হয় তাঁকে। প্রথমে পিঠে, তারপর বুকে লাগে দুটি গুলি।
রক্তাক্ত অবস্থায় প্রায় আধ ঘণ্টা স্টেশন চত্বরে পড়ে ছিলেন তিনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন—"আমায় বাঁচাও"। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই নিভে যায় এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। সেদিনই শেষ হয় সুঁটিয়ার মানুষের কাছে ‘মাস্টারদা’ নামে পরিচিত বরুণ বিশ্বাসের জীবন।
প্রতিবাদের ভাষা শিখিয়েছিলেন সুঁটিয়াকে
পরদিন প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেছিলেন। ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন স্থানীয় মহিলারা। ভাঙচুর করা হয়েছিল পুলিশ ফাঁড়ি, প্রায় ১০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিল ৩৫ নম্বর জাতীয় সড়ক।
বরুণ বিশ্বাসের দেহ ছুঁয়ে বহু মানুষ শপথ নিয়েছিলেন, প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তবে সময়ের সঙ্গে সেই আন্দোলনের তীব্রতা কমেছে। আজও পরিবারের দাবি, বরুণ বিশ্বাস হত্যার পূর্ণাঙ্গ বিচার হয়নি।
কে ছিলেন বরুণ বিশ্বাস?
কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের বাংলা শিক্ষক ছিলেন বরুণ বিশ্বাস। কিন্তু শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি হয়ে উঠেছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্তবর্তী গ্রাম সুঁটিয়ার সামাজিক প্রতিরোধের মুখ।
১৯৯০-এর দশক থেকে ২০০০-এর দশকের গোড়ায় সুঁটিয়া ও আশপাশের এলাকায় দুষ্কৃতীচক্রের বিরুদ্ধে কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহিলাদের উপর লাগাতার যৌন নির্যাতন, ভয় দেখানো, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বহু ঘটনায় অভিযোগ দায়েরই হয়নি বলে স্থানীয়দের দাবি।
এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদের ডাক দেন বরুণ বিশ্বাস।
গড়ে ওঠে 'সুঁটিয়া ধর্ষণ বিরোধী মঞ্চ'
তরুণ বয়সেই তিনি গড়ে তোলেন 'সুঁটিয়া ধর্ষণ বিরোধী মঞ্চ'। গ্রামে গ্রামে মানুষকে সংগঠিত করেন। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে একের পর এক অভিযোগপত্র পাঠান। নির্যাতিত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ান। রাতভর গ্রামে টহল দিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন।
ধীরে ধীরে প্রশাসনেরও নজর পড়ে। পরে সিআইডি তদন্তে একাধিক অভিযুক্ত গ্রেফতার হয় এবং কয়েকজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হয়।
এরপর শুরু হয় নতুন লড়াই
যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর বরুণ বিশ্বাস শুরু করেন আরেকটি আন্দোলন। অভিযোগ ছিল, অবৈধভাবে নদীর মাটি কেটে পাচার করা হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়ছে সুঁটিয়া ও সংলগ্ন এলাকা।
এই মাটি মাফিয়ার বিরুদ্ধেও সরব হন তিনি। স্থানীয়দের একাংশের মতে, এই আন্দোলনই তাঁকে আরও বড় বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।
হত্যা মামলার তদন্তে কী উঠে আসে?
২০১৬ সালে পুলিশ বরুণ বিশ্বাস হত্যা মামলায় কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। তদন্তে উঠে আসে, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক অপরাধীর নির্দেশে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।
তবে পরিবারের দাবি, হত্যার নেপথ্যের প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারী এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে আজও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, প্রভাবশালী কয়েকজনের নাম সামনে এলেও সেই দিকটি যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি।
পুনর্তদন্তের দাবি পরিবারের
রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বরুণ বিশ্বাসের পরিবার মামলার পুনর্তদন্তের দাবি তুলেছে। তাঁদের বক্তব্য, প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত বিচার সম্পূর্ণ হবে না।
বর্তমানে বনগাঁ মহকুমা আদালতে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলমান।
১৪ বছর পরও উত্তর খুঁজছে সুঁটিয়া
বরুণ বিশ্বাস শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক। সীমান্তবর্তী এক গ্রামের সাধারণ মানুষকে ভয় কাটিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুর এক দশকেরও বেশি সময় পরে প্রশ্ন এখনও একই—বরুণ বিশ্বাস হত্যার নেপথ্যের সম্পূর্ণ সত্য কি কোনওদিন সামনে আসবে? প্রকৃত দোষীদের বিচার কি শেষ পর্যন্ত হবে? সেই উত্তরের অপেক্ষাতেই রয়েছে সুঁটিয়া।