তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবার পৌঁছে গেল জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দোরগোড়ায়। সোমবার দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দফতরে গিয়ে বিদ্রোহী শিবিরের অভিযোগের বিরুদ্ধে বিস্তারিত লিখিত জবাব জমা দিল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের পক্ষ থেকে কমিশনের সামনে উপস্থিত ছিলেন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র এবং সাগরিকা ঘোষ।
তৃণমূলের দাবি, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তথাকথিত 'নব্য তৃণমূল' গঠনের দাবি সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক, ভিত্তিহীন এবং দলের গঠনতন্ত্রবিরোধী। একইসঙ্গে বিদ্রোহী নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তাঁদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ এবং ‘মেরুদণ্ডহীন’ বলেও মন্তব্য করেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
কমিটির মেয়াদ নিয়ে পাল্টা যুক্তি
বিদ্রোহী শিবিরের অভিযোগ ছিল, ২০২২ সালে গঠিত সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির তিন বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। সেই দাবি খারিজ করে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের সামনে দলের সাংগঠনিক ইতিহাস তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ১৯৯৭ সালে নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে দলের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ম মেনেই পরিচালিত হয়েছে। ২০০৬ সালে দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে কমিটির মেয়াদ চার বছর থেকে পাঁচ বছর করা হয়। সেই অনুযায়ী ২০২২ সালেও ব্লক, জেলা ও রাজ্যস্তরে সাংগঠনিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুনরায় দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন।
তাঁর দাবি, তাই তিন বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার যে যুক্তি বিদ্রোহীরা দিচ্ছেন, তার কোনও আইনি ভিত্তি নেই।
বিধায়কদের পদত্যাগের দাবি
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, যদি বিদ্রোহী নেতাদের দাবি অনুযায়ী দলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে থাকে, তাহলে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরা কীভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়লেন?
তাঁর বক্তব্য, নিজেদের যুক্তি মেনে চলতে হলে বিদ্রোহী বিধায়কদের অবিলম্বে বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া উচিত।
'নব্য তৃণমূল' নিয়ে প্রশ্ন
কল্যাণের অভিযোগ, বিদ্রোহী নেতারা দলের গঠনতন্ত্র অনুসরণ না করেই নতুন সংগঠন তৈরির দাবি করেছেন। তিনি বলেন, দলের কোনও অনুমোদিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি, ব্লক বা জেলা কমিটির মতামত নেওয়া হয়নি এবং বৈধ সাংগঠনিক প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি।
এছাড়াও তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধায়ক ও সাংসদদের বৈঠকেও বিদ্রোহী নেতারা উপস্থিত ছিলেন এবং বিভিন্ন সরকারি নথিতেও তাঁরা নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য হিসেবেই পরিচয় দিয়েছেন।
বিজেপির মদতের অভিযোগ
বিদ্রোহী শিবিরের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রত্যক্ষ মদতের অভিযোগও তোলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনেই বিদ্রোহী নেতারা এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস পাচ্ছেন।
তিনি জানান, তৃণমূল কংগ্রেস আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও এই ইস্যুতে আন্দোলন চালিয়ে যাবে এবং প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হবে।
'সবথেকে বড় বিশ্বাসঘাতক' মন্তব্য
দলের একসময়ের শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, যাঁরা দলের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন, তাঁরাই আজ দল ছেড়েছেন।
তিনি বিশেষভাবে ববি হাকিমের নাম উল্লেখ করে তাঁকে ‘সবথেকে বড় বিশ্বাসঘাতক’ বলে আক্রমণ করেন। পাশাপাশি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ বিদ্রোহী নেতাদের বিরুদ্ধে সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অভিযোগও তোলেন।
তৃণমূলের দাবি, বিদ্রোহী শিবিরের অভিযোগের কোনও সাংগঠনিক বা আইনি ভিত্তি নেই। অন্যদিকে, বিদ্রোহী শিবির এখনও পর্যন্ত কমিশনে জমা দেওয়া তৃণমূলের এই পাল্টা বক্তব্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।