রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। বিধানসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দলের স্বীকৃতি পেল তৃণমূল কংগ্রেসের ৫৮ জন বিক্ষুব্ধ বিধায়ক। বুধবার বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোস বিক্ষুব্ধ শিবিরের জমা দেওয়া চিঠিতে অনুমোদন দেওয়ার পরেই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।
স্পিকারের স্বীকৃতির পর বিধানসভার সচিব সৌমেন্দ্র নাথ দাস বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে তাঁর জন্য নির্ধারিত দপ্তরের চাবি তুলে দেন। ফলে বিধানসভার অন্দরে কার্যত একটি নতুন বিরোধী শক্তির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটল।
বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত
স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিধানসভায় সাংবাদিক সম্মেলন করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, আপাতত ৫৮ জন বিধায়কের লিখিত সমর্থন তাঁদের কাছে রয়েছে। পাশাপাশি আরও দু'জন বিধায়কের পূর্ণ সমর্থনও তাঁদের পক্ষেই রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। সেই হিসেবে তাঁদের মোট সদস্য সংখ্যা ৬০ বলেই ধরে নেওয়া উচিত বলে মত তাঁর।
ঋতব্রত আরও ইঙ্গিত দেন, আগামী দিনে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে নতুন বিরোধী দলের উপ-দলনেতা হিসেবে জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, সন্দীপন সাহা এবং শিউলি সাহার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। চিফ হুইপের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আখেরুজ্জামানকে।
‘মমতাই আমাদের নেত্রী’
নতুন রাজনৈতিক অবস্থান সত্ত্বেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজেদের রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবেই দেখতে চাইছেন বিক্ষুব্ধ বিধায়কেরা।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দলের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখতে চান তাঁরা। একই সুরে চিফ হুইপ আখেরুজ্জামান জানান, “আমাদের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। আমরা এখনও তৃণমূল কংগ্রেসেরই বিধায়ক, এই বিষয়ে কোনও বিভ্রান্তির অবকাশ নেই।”
সরকারের ভালো কাজের পাশে, ভুলের বিরোধিতায়
আগামী দিনে বিধানসভায় তাঁদের ভূমিকা কী হবে, সেই বিষয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বিরোধী দলনেতা। তাঁর বক্তব্য, জনস্বার্থবিরোধী কোনও সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা সরব হবেন। তবে শুধুমাত্র বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, সরকারের কোনও ইতিবাচক ও জনমুখী পদক্ষেপ থাকলে তা সমর্থনও করবেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি মেনেই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দলের বৈঠকে আলোচনা করে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ক্ষোভের নেপথ্যে কী?
বিক্ষুব্ধ শিবিরের নেতাদের দাবি, বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই মূলত এই সংকটের সূত্রপাত। আখেরুজ্জামানের অভিযোগ, তাঁদের দু'বার কালীঘাটে ডাকা হলেও মতামতকে কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
এছাড়াও একটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে দলীয় বিধায়কদের সই জাল করার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উলুবেড়িয়ার বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে সহযোগিতা করেছেন এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা।
মুখ্যমন্ত্রীর সাক্ষাৎ ঘিরে জল্পনা
এদিকে, এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বুধবার নবান্নে কলকাতা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও হাওড়ার বিধায়কদের নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বৈঠক শেষে তিনি বিধানসভায় এসে স্পিকার রথীন্দ্র বোসের ঘরে যান। সূত্রের খবর, সেখানে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল বিধায়কদের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পিকার বিক্ষুব্ধ শিবিরের চিঠিতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেন।
নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত?
সব মিলিয়ে ৬০ জন বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিধানসভার অন্দরে ‘নতুন তৃণমূল’-এর উত্থান রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। আগামী দিনে এই শিবির আরও শক্তিশালী হবে কি না এবং রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।