একটি রাজনৈতিক দলের প্রতীকে জয়, ভোটের পর অন্য রাজনৈতিক দলকে সমর্থন তারও পরে তৃতীয় দলের সঙ্গে সংযুক্তি এবং ক্ষমতার সঙ্গে থাকা !! এদিকে, একই প্রতীকে জয়ী রাজ্য বিধানসভার একদল সদস্য ভোটে জিতেই প্রতীক বদল না করেই দল ভেঙে যাদের বিরুদ্ধে লড়াই তাদের পক্ষ অবলম্বন করে নিজেদেরকে "আসল" বলে দাবি করে একই দলের জয়ী অন্য বিধায়কদের থেকে আলাদা ব্লকে বসার দাবি জানিয়েছেন। তবে দিল্লি থেকে কলকাতা সব পক্ষের দাবি একটাই "আমরা উন্নয়নের পক্ষে ও মানুষের পক্ষে। কারণ গণতন্ত্রে মানুষই শেষ কথা।"
আর এই পরিস্থিতির সুযোগে রাজ্যের শাসকপক্ষ বিরোধীপক্ষকে বার্তা দিচ্ছেন "মোদীজির লাইন মেনে না চললেই বেলাইন হয়ে জনবিচ্ছিন্ন হতে হবে। তাঁরা ধীরে ধীরে ছিন্নমূল হয়ে যাবেন।" দিল্লি থেকে কলকাতা এ এক বিরল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি বঙ্গের রাজনীতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাঙালি জাতির গৌরবজনক অধ্যায়ে এই 'বিচিত্র' ঘটনা বাঙালির অবক্ষয় বললে অত্যুক্তি হয় না।
বস্তুত, দেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনায় 'জনগণ' বা 'মানুষ' হল একটি নির্বাচিত সরকার তথা আইনসভার অপরিহার্য অঙ্গ। যার নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় নেতারা সাধারণ মানুষ থেকে উঠে আসবেন।জনগণ তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন এবং তাদের সম্মতিতেই সরকার চলবে। যে সরকারের মূল উদ্দেশ্য হবে দেশের সকল নাগরিকের কল্যাণ ও অধিকার নিশ্চিত করা। অথচ একটি এলাকার মানুষের সমর্থনের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি হয়ে আইনসভার সদস্য হয়ে যদি কোনও বিধায়ক মানুষের (ভোটারের) সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচারন করেন বা অন্য প্রতীকে বা দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান তাতে গণতন্ত্রের স্বার্থ কতটা রক্ষা হয় ? মানুষের সিদ্ধান্তের মর্যাদাই বা কতটা দেওয়া হয় ? আর এই দুই ক্ষেত্রই যদি উপেক্ষিত হয় তাহলে সংবিধানের মর্যাদা যে লঙ্ঘিত হয় তা বলাই বাহুল্য। তবে এই ধরণের বিরল রাজনৈতিক "সুবিধাবাদ" বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রকে "গ্রেট পলিটিকাল সার্কাস'-এ পরিণত করেছে তা বলাই যায।
কিন্তু গণতন্ত্রকে 'হাস্যকর' করা এই ধরণের রাজনৈতিক 'মেলোড্রামা' আটকাতে যে দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) রয়েছে এক্ষেত্রে তা কার্যকর হচ্ছে না কেন ? ১৯৮৫ সালে সংবিধানের ৫২তম সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের 'দশম তফসিল' (Tenth Schedule) যুক্ত করে এই আইনটি প্রণয়ন করার মূল লক্ষ্য হল এই বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত লাভ বা প্রলোভনের বশবর্তী হয়ে ঘন ঘন দলবদল বন্ধ করা এবং এর ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রোধ করা। এই আইনে ছাড় পেতে হলে দুটি শর্ত প্রয়োজন। ভোটের পর যে দলের প্রতীকে আইনসভার সদস্যরা জয়ী হয়েছেন সেই দল অন্য দলের সঙ্গে সংযুক্ত বা মার্জার হলে এবং দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক বা সাংসদ অন্য কোনও দলের সঙ্গে মিশে যান বা আলাদা একটি দল গঠন করেন তবে তাঁদের সদস্যপদ খারিজ হয় না। দলত্যাগ সংক্রান্ত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন সংসদের বা বিধানসভার স্পিকার রাজ্যসভার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান।
তবে স্পিকারের এই সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ বা বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার (Judicial Review) আওতাভুক্ত হতে পারে। অথচ যে আইনের মূল উদ্দেশ্য জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ক্ষমতার লোভে যেন সরকার পতন বা অস্থিতিশীলতা তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করা সেই আইনকে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না বলেও পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন আইনজীবী থেকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। দলত্যাগ বিরোধী আইনের দুটি শর্তের মধ্যে দ্বিতীয়টিকে প্রচারের আলোয় আনা হলেও প্রথম শর্তটিকে সেভাবে আমল দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা।