দার্জিলিং পাহাড়ের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিমল গুরুং। একসময় গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা এই নেতা দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনি জটিলতা এবং আত্মগোপনের পর ফের পাহাড়ের ক্ষমতার সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
মঙ্গলবার কার্শিয়াং সফরে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাশে একই মঞ্চে দেখা গেল বিমল গুরুংকে। সেই দৃশ্য ঘিরেই নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। পাহাড়ে বিজেপি-সমর্থিত শক্তিগুলির উত্থানের নেপথ্যে বিমল গুরুংয়ের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা আরও একবার সামনে এল বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
কার্শিয়াংয়ে জনকল্যাণ শিবির পরিদর্শনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য একাধিক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাস্তা, পর্যটন, চা-বাগান শ্রমিকদের কল্যাণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সরকার নতুন প্রকল্প গ্রহণ করবে।
একইসঙ্গে পাহাড়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, জিটিএ-র আড়ালে অতীতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাট হয়েছে। সেই সমস্ত ফাইল খতিয়ে দেখা হবে এবং শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে।
এই কর্মসূচিতে বিমল গুরুংয়ের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। ২০১৭ সালে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সময় পুলিশ অফিসার অমিতাভ মালিক হত্যাকাণ্ডের মামলায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার ফলে পাহাড়ের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব কমে গিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে ফের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছেন তিনি।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিমল গুরুংয়ের নেতৃত্বাধীন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা এবং জিএনএলএফ পাহাড়ে শক্তিশালী জোট গড়ে তোলে। নির্বাচনে পাহাড়ের তিনটি আসনেই জয় পেয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে কার্যত রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে দেয় এই জোট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাহাড়ের ভোটব্যাঙ্ক ও জনমতের ওপর এখনও বিমল গুরুংয়ের প্রভাব যথেষ্ট রয়েছে। একসময় যাঁরা তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, সেই অনীত থাপা ও অজয় এডওয়ার্ডদের প্রভাবও বর্তমানে অনেকটাই কমে গিয়েছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের একাংশের।
২০০৭ সালে সুবাস ঘিসিংয়ের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে যেভাবে পাহাড়ের নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন বিমল গুরুং, সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল সেই প্রভাবের ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাই কার্শিয়াংয়ের মঞ্চে শুভেন্দু অধিকারীর পাশে বিমল গুরুংয়ের উপস্থিতি শুধু একটি রাজনৈতিক ছবি নয়, বরং পাহাড়ের ভবিষ্যৎ রাজনীতির নতুন বার্তাও বহন করছে।