বিশ্ব রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। দুই দেশকে সরাসরি সংযুক্ত করার লক্ষ্যে বেরিং প্রণালির নিচ দিয়ে প্রস্তাবিত ‘পুতিন-ট্রাম্প টানেল’ প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে নিতে শুক্রবার একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ঘোষণা করেছে মস্কো।
রুশ প্রেসিডেন্ট Vladimir Putin-এর বিশেষ দূত Kirill Dmitriev সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামে এই তথ্য প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
কী এই ‘পুতিন-ট্রাম্প টানেল’?
প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুযায়ী, বেরিং প্রণালির নিচ দিয়ে একটি বিশাল টানেল নির্মাণ করা হবে, যা রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে স্থলপথে সংযুক্ত করবে।
বেরিং প্রণালী রাশিয়ার পূর্ব প্রান্ত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার মধ্যে অবস্থিত। বর্তমানে এই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি স্থল সংযোগ নেই। টানেলটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্প।
দিমিত্রিয়েভ বলেন, “এটি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সংযোগ প্রকল্পগুলোর একটি হতে পারে। আগামী দিনে এ বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হবে।”
নকশা প্রণয়নের জন্য চুক্তি
রুশ দূতের দাবি, প্রকল্পের সম্ভাব্য নকশা ও কারিগরি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
যদিও প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয়, সময়সীমা কিংবা বাস্তবায়ন কাঠামো সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি, তবুও এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ মহল এবং অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে।
ট্রাম্প ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগ
দিমিত্রিয়েভ আরও জানান, সম্প্রতি তিনি মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর জামাতা Jared Kushner-এর সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন।
তাঁর দাবি, ওই আলোচনায় মূলত রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য যৌথ প্রকল্প নিয়ে কথা হয়েছে।
তবে মার্কিন পক্ষ এখনও পর্যন্ত এই ফোনালাপের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেনি।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা
দিমিত্রিয়েভের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশ বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগ এবং সম্ভাব্য যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়েও আলোচনা করছে।
তিনি বলেন, “রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্য লাভজনক হতে পারে এমন একাধিক প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে। বিশেষ করে রাশিয়ার অভ্যন্তরে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা খুঁজছে দুই দেশ।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গও উঠে এল
ফোরামের আলোচনায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ও উঠে আসে।
দিমিত্রিয়েভ দাবি করেন, মার্কিন প্রশাসন এখনও শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কিয়েভকে আলোচনার পথে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিচ্ছে।
অন্যদিকে ক্রেমলিনের মুখপাত্র Dmitry Peskov সম্প্রতি জানিয়েছেন, মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধ সংক্রান্ত আলোচনা বর্তমানে স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
পেসকভের বক্তব্য, ইউক্রেন যদি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব করে এবং শান্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে, তাহলে রাশিয়া তার সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে।
শান্তির সম্ভাবনা এখনও ক্ষীণ?
এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, বর্তমানে মস্কো এবং কিয়েভ—উভয় পক্ষই আপস করতে অনিচ্ছুক। ফলে যুদ্ধের দ্রুত অবসানের সম্ভাবনা এখনও খুবই সীমিত।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সম্ভাব্য অবকাঠামো প্রকল্প এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ ভবিষ্যতে বৃহত্তর সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে।
বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে বিশ্ব মানচিত্রের যোগাযোগ ব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘পুতিন-ট্রাম্প টানেল’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা শুধু রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বের বাণিজ্য, পরিবহণ এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে।
যদিও প্রকল্পটি এখনও পরিকল্পনা ও নকশা পর্যায়ে রয়েছে, তবুও দুই পরাশক্তির মধ্যে এমন একটি সংযোগ প্রকল্পের আলোচনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন নজর থাকবে, শুক্রবারের চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রকল্পটি কত দ্রুত বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব কতটা গভীর হয়।