দীর্ঘ সাত বছর পর আবারও উত্তর কোরিয়া সফরে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সোমবার পিয়ংইয়ংয়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে তার। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর শুধু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং পূর্ব এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের কৌশলগত অবস্থান পুনর্নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
২০২৫ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বেইজিংয়ে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে শি জিনপিং ও কিম জং উনের সাক্ষাৎ হয়েছিল। তবে এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হলো—শি নিজেই পিয়ংইয়ং সফরে যাচ্ছেন। ২০১৯ সালের পর তিনি আর উত্তর কোরিয়া সফর করেননি এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশ সফরের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা সম্পর্ক। দীর্ঘদিন ধরে উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশীদার ছিল চীন। দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগই চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের মতে, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে, যার বিনিময়ে মস্কোও পিয়ংইয়ংকে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা প্রদান করছে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি বেইজিংকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, উত্তর কোরিয়ার ওপর রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব চীনের ঐতিহ্যগত প্রভাববলয়কে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। ফলে শি জিনপিংয়ের সফরের মাধ্যমে চীন আবারও পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে এবং নিজের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতাও এই সফরের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হতে পারে। বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়াকে আরও বেশি বাণিজ্যিক সুবিধা, বিনিয়োগ কিংবা অবকাঠামোগত সহযোগিতার প্রস্তাব দিতে পারে চীন। এর মাধ্যমে রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে নিজেদের গুরুত্ব আরও বাড়াতে চায় বেইজিং।
তবে শুধু অর্থনীতি নয়, উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়েও চীনের উদ্বেগ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও উত্তর কোরিয়ার অতিরিক্ত সামরিক শক্তি অর্জনকে পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখছে না বেইজিং।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার সহায়তায় উত্তর কোরিয়া যদি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অস্ত্র ব্যবস্থা কিংবা পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে তোলে, তাহলে তা কোরীয় উপদ্বীপের বিদ্যমান কৌশলগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
চলতি বছরেই একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। পাশাপাশি নতুন এআই-নির্ভর ট্যাকটিক্যাল ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রদর্শন এবং পারমাণবিক উপাদান উৎপাদন কেন্দ্র পরিদর্শনের ছবি প্রকাশ করে দেশটি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে।
অন্যদিকে, পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও শি জিনপিংয়ের সফরের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মধ্যে সম্ভাব্য সামরিক ও লজিস্টিক সহযোগিতা বৃদ্ধির আলোচনা, জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক উপস্থিতি—সবকিছুই চীনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করে পূর্ব এশিয়ায় নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে বেইজিং। ফলে শি জিনপিংয়ের এই সফর শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, রাশিয়া-চীন প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা রাজনীতির দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।