থাই ম্যাসাজে ভারতীয় যোগের ছোঁয়া: দুই প্রাচীন ঐতিহ্যের অসাধারণ মেলবন্ধন
কলকাতা: আন্তর্জাতিক যোগ দিবসকে ঘিরে যখন দেশজুড়ে যোগচর্চা ও সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে, তখন নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ভারতীয় যোগশাস্ত্র এবং থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী থাই ম্যাসাজের গভীর সম্পর্ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, থাই ম্যাসাজ বা ‘নুয়াদ থাই’ শুধুমাত্র একটি ম্যাসাজ পদ্ধতি নয়, বরং এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ভারতের হাজার বছরের পুরনো যোগ ও আয়ুর্বেদের দর্শনে।
পশ্চিমবঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে এবার বড় আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। কলকাতায় অনুষ্ঠিতব্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতির কথা রয়েছে। এই আবহেই ভারতীয় যোগের আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং থাই ম্যাসাজের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সংযোগ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যোগের উৎপত্তি ভারতে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। শরীর, মন এবং আত্মার সমন্বয় ঘটিয়ে সামগ্রিক সুস্থতা অর্জনই এর মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বিকশিত থাই ম্যাসাজ ভারতীয় আয়ুর্বেদ, যোগশাস্ত্র এবং বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাবেই গড়ে ওঠে। ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে এই জ্ঞান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং থাইল্যান্ডে নতুন রূপ লাভ করে।
দুই পদ্ধতির মূল ভিত্তিই হলো শরীরের জীবনীশক্তির প্রবাহ। যোগশাস্ত্রে একে বলা হয় ‘প্রাণ’, যা শরীরের বিভিন্ন ‘নাড়ি’-পথে প্রবাহিত হয়। থাই ম্যাসাজে একই ধারণা প্রকাশ পেয়েছে ‘সেন লাইন’-এর মাধ্যমে। বিশ্বাস করা হয়, শরীরে শক্তির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হলে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। সেই বাধা দূর করতেই ব্যবহার করা হয় বিশেষ চাপ, প্রসারণ ও শ্বাস-সচেতনতার কৌশল।
থাই ম্যাসাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ডাইনামিক স্ট্রেচিং বা গতিশীল প্রসারণ। ফরোয়ার্ড বেন্ড, ব্যাকবেন্ড, স্পাইনাল টুইস্ট কিংবা হিপ ওপেনারের মতো নানা কৌশল দেখতে অনেকটাই পশ্চিমোত্তানাসন, ভুজঙ্গাসন, অর্ধমৎস্যেন্দ্রাসন বা অঞ্জনেয়াসনের মতো যোগভঙ্গির অনুরূপ। তবে এখানে পার্থক্য হলো, যোগচর্চায় ব্যক্তি নিজেই আসন ধরে রাখেন, আর থাই ম্যাসাজে প্রশিক্ষিত থেরাপিস্ট শরীরকে সেই ভঙ্গিতে নিয়ে যান। এই কারণেই থাই ম্যাসাজকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘প্যাসিভ যোগ’ বলে অভিহিত করেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দাবি, থাই ম্যাসাজ শরীরের নমনীয়তা বৃদ্ধি, জয়েন্টের কার্যক্ষমতা উন্নত করা, রক্ত ও লসিকা সঞ্চালন বাড়ানো এবং দীর্ঘস্থায়ী পেশির ব্যথা ও মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। পাশাপাশি এটি শরীর ও মনে গভীর প্রশান্তি এনে দেয়, যা ধ্যান বা মেডিটেশনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনীয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক স্বাস্থ্যচর্চা ও বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে থাই ম্যাসাজের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে। অনেক আন্তর্জাতিক যোগকেন্দ্র এখন থাই ম্যাসাজভিত্তিক স্ট্রেচিং ও থেরাপিউটিক সেশনকে তাদের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমিত শারীরিক সক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যও এটি যোগের সুফল পাওয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
ভারতীয় যোগ এবং থাই ম্যাসাজের এই অনন্য মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে শরীর, মন ও জীবনীশক্তির ভারসাম্য রক্ষার জ্ঞান মানবসভ্যতার এক অমূল্য ঐতিহ্য, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।